Reading Time: 1 minute

“আধুনিক পদার্থবিদ্যা” আলোচনার প্রথম পর্বে সবাইকে সুস্বাগতম। চার পর্বের এই সিরিজে প্রথম যে বিষয়টির উপর আমরা ফোকাস করতে যাচ্ছি তা হল আলোক তড়িৎ ক্রিয়া (Photoelectric Effect)। মাথা ও জীবন – দু’টিকেই নষ্ট করা মডার্ন ফিজিক্সের গোড়াপত্তনে যে ঘটনার অবদান সবচেয়ে বেশি বলে বিবেচিত তা এই ফটোইলেক্ট্রিক ইফেক্ট বৈ আর কিছু নয় 😛

মডার্ন ফিজিক্সে যা আলোচিত হয় তা কেন মডার্ন ফিজিক্সই, সনাতনী চিন্তাধারার সাথে এর বৈসাদৃশ্য কোথায় তার উত্তরও খুঁজে পাব আমরা এখানে। সরাসরি তাহলে আমরা ঢুকে পড়ি আমাদের আলোচ্য বিষয়ে।

আলোক তড়িৎ ক্রিয়া প্রথম যে বিজ্ঞানী প্রত্যক্ষ করেন বলে ইতিহাস বলে তিনি হলেন হেনরিখ হার্জ (Heinrich Hertz), ১৮৮৭ সালে। হার্জ কাজ করছিলেন দু’টি ধাতব ইলেকট্রোড নিয়ে, যাদের মধ্যে ইলেকট্রিক ডিসচার্জ বা স্পার্ক সৃষ্টি (সেটা তিনি কীভাবে করেছিলেন এটা তার ব্যাপার) ছিল তার পরীক্ষণের উদ্দেশ্য। পরীক্ষার এক পর্যায়ে তিনি লক্ষ্য করলেন, অতিবেগুনি রশ্মি দ্বারা যদি এই ইলোকট্রোড দু’টিকে আলোকিত করা যায় তবে ক্ষরণ বা স্পার্কের তীব্রতা এক্সপেরিমেন্ট থেকে যেভাবে পাওয়া উচিত তা অপেক্ষা বেশ বেড়ে যায়। খুশি হয়ে তিনি ভাবতে থাকেন, কে এই অতিবেগুনি রশ্মি? কী ই বা এর যাদুকরী ক্ষমতা যার বলে এত বৈপ্লবিক পরিবর্তন এল স্পার্কের পরিমাণের? এই ঘটনার রেশ মুছে যেতে না যেতেই এক বছরের মাথায় হলওয়াক (Hallwachs) নামের একজন বিজ্ঞানী দেখতে পান, ঋণাত্মকভাবে আহিত বস্তুর উপর অতিবেগুনি রশ্মি পড়লে বস্তুটির আধান হ্রাস পেতে থাকে, অথচ ধনাত্মক চার্জে চার্জিত বস্তুর ক্ষেত্রে এমন কোনো ঘটনা ঘটে না। এর ঠিক দশ বছর পর (১৯৯৭) থমসন (Thomson) এবং লেনার্ড (Lenard) পরীক্ষা করে দেখিয়ে দেন – আর কিছু নয়, স্পার্ক বাড়ার ঐ ঘটনা কিংবা ঋণাত্মক চার্জ কমে যাওয়া আসলে একটা ঘটনার ফলাফল – ঐ বস্তুগুলো হতে ইলেট্রন নির্গত হওয়া। অতিবেগুনি রশ্মি শুধু কলকাঠি নাড়ছে এই ইলেকট্রন নিঃসরণের পিছনে।

চল তবে দেখে আসা যাক কত সহজ পথেই না এই প্রমাণটি করেছিলেন লেনার্ড সাহেব। নিচের চিত্রটি দেখ, এটাকে বলে ফটোসেল। এখানে ব্যাটারির দুই প্রান্তের সাথে সংযোগ স্থাপন করে আমরা ধাতব ক্যাথোড এবং অ্যানোড তৈরি করেছি এবং তাদের রেখেছি একটি ভ্যাকুয়াম টিউবে (ভ্যাকুয়াম টিউবে রাখার কারণ, ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট স্টাডি যাতে কেবল মেটালের জন্যেই করা যায়, বাতাসে থাকা অন্য কোনো পদার্থ যেন ঝামেলা না বাঁধায়)। এমনিতেই ধাতুর পৃষ্ঠে মুক্ত ইলেকট্রন থাকে, তার উপর একটিকে ক্যাথোড বানানোয় সে আরো ইলেকট্রন সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। এমতাবস্থায় ক্যাথোডের উপর অতিবেগুনি রশ্মি ফেলা হল।সসফলে যা হবার হল সেটাই – ক্যাথোড থেকে ফটোইলেকট্রন নির্গত হয়ে আঘাত করতে থাকলে অ্যানোডে। অ্যানোড তো আর ইলেকট্রন নিয়ে চুপ করে বসে থাকবে না। অ্যানোড ব্যাটারির ধনাত্মক প্রান্তের সাথে যুক্ত বিধায় ইলেকট্রন এগিয়ে যাবে সেদিকে। এই ইলেকট্রন পরবর্তীতে পুরো বর্তনী ঘুরে যেয়ে পোঁছাবে আবার সেই ক্যাথোডেই। এভাবে নির্গত ইলেকট্রনগুলো বর্তনী পূর্ণ করবে এবং তাতে তড়িৎপ্রবাহের উদ্ভব ঘটাবে যা বর্তনীতে যুক্ত অ্যামিটার দ্বারা সহজেই নির্ণয় করা যাবে। ব্যাটারি ব্যবহার করা ছাড়াও এই পরীক্ষণটা করা যেত, তবে পরীক্ষণটি আরো সুবিধাজনক অবস্থা করতেই আমরা ব্যাটারি লাগিয়েছি (এই যেমন ব্যাটারির ধনাত্মক প্রান্ত অ্যানোডে পড়া ইলেকট্রন নিজের দিকে টেনে তড়িৎপ্রবাহ ঘটা সহজ করে দিয়েছে)।

উল্লেখ্য লেনার্ড চালাকি করে নির্গত ইলেকট্রনগুলোর গতিশক্তি বের করার ব্যবস্থাও করে ফেলেছিলেন। সেটার জন্য ফটোসেলসহ বর্তনীটা সাজানো হয়েছিল এভাবে-el - Copy - Copy (2)খুব জটিল লাগলেও এখানে খুব জটিল কিছু ঘটে যায় নি। ভ্যাকুয়াম টিউবের সাথে সমান্তরালে ভোল্টমিটার (এই ভোল্টমিটার আমাদের ব্যবহৃত ব্যাটারির দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্য দেখাবে বিভিন্ন সময়) এবং একটি পরিবর্তনশীল বিদ্যুৎ উৎস (এই ব্যাটারির তড়িচ্চালক শক্তি আমরা ইচ্ছামত বাড়াতে বা কমাতে পারব) যুক্ত করা হল। বিদ্যুৎ উৎসের পাশেই দেখ মাইক্রোঅ্যামিটার আছে যা বলে দেবে সার্কিটে ক্ষুদ্র মাত্রার হলেও কারেন্ট আছে কি নেই। প্রথমে আমরা ব্যাটারির তড়িচ্চালক শক্তিকে শূন্য বানিয়ে নিই। এতে ধাতব দন্ডগুলোকে আর অ্যানোড বা ক্যাথোড নামকরণ করতে হবে না। এই অবস্থায় বামপাশের দন্ডে আমরা অতিবেগুনি রশ্মি ফেললাম ও তা ইলেকট্রন নির্গত করল। লক্ষ্য কর, এতে ডানপাশে যে ধাতব দন্ডের উপর ইলেকট্রন এসে পড়ল তার লক্ষ্য থাকবে ইলেকট্রনগুলো বর্তনীতে যোগান দিয়ে আবার বামপাশের দন্ডে পৌঁছে দিতে (বর্তনী ব্যবহার করা ছাড়া এই কাজ করার জন্য অন্য কোনো উপায়ও নেই)। ওদিকে ইলেকট্রন হারিয়ে ধনাত্মকভাবে আহিত হতে থাকা মেরুনরঙা দন্ডটিও মরিয়া বর্তনীর পথ ধরে সবুজ দন্ডের কাছ থেকে তার হারানো ইলেকট্রন বুঝে পেতে। এই যখন অবস্থা, তখন দেখবে অ্যামিটার বিক্ষেপ দিচ্ছে। তারমানে ইলেকট্রনগুলো তাদের গতিবেগ সহকারে সুখে শান্তিতে বর্তনী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এখানেই শুরু ব্যাটারির মজা। এতক্ষণ খেয়াল করেছ কি না জানি না, লক্ষ্য করে দেখ এখানে ডানপাশের দন্ডতে কিন্তু ব্যাটারির ঋণ প্রান্ত যুক্ত আছে। তারমানে এখন যদি আমরা ব্যাটারির তড়িচ্চালক শক্তি শূন্য থেকে বাড়াই, এই ঋণ প্রান্ত ডান পাতের ইলেকট্রনগুলোকে বিকর্ষণ করবে এবং আর সহজে তাদের বর্তনীতে চলাচল করতে দেবে না। খুব অল্প পরিমাণ ভোল্টেজে যেসব ইলেকট্রন কম গতিশক্তির, কেবল তারাই বাধা পেয়ে বর্তনীতে আসতে পারবে না, উচ্চশক্তির ইলেকট্রনেরা কোনোরকম পার পেয়ে চলে যাবে (অ্যামিটারে আগের চেয়ে কম বিক্ষেপ পাওয়া যাবে)। দুষ্টুমি করে এই তড়িচ্চালক শক্তি যদি আরো বাড়াই তবে আরো কপাল পুড়বে ইলেকট্রনদের। সবচেয়ে শক্তিধর ইলেকট্রনটাও তখন আর এই বাধা ডিঙ্গিয়ে ওপারে যেতে পারবে না। যে ন্যূনতম ভোল্টেজে সবচেয়ে গতিধর ইলেকট্রনটাও থমকে যায়, অ্যামিটার শূন্য পাঠ দেয় সেটা ব্যবহার করেই আমরা নির্গত ফটোইলেকট্রনদের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ গতিশক্তি মেপে ফেলতে পারি। দেখ তো এই সমীকরণটা মনে পড়ে কি না :

Kmax = 1/2 mv2 = eV

জ্বী, এখানে ঐ বাধাদানকারী ভোল্টেজের সাথে ইলেক্ট্রনের চার্জ গুণ করে দিলেই সর্বোচ্চ গতিশক্তিটা পাওয়া যাচ্ছে।

লেনার্ড সাহেব ছিলেন সনাতনী পদার্থবিজ্ঞান পড়া লোক, তিনি অতিবেগুনি রশ্মি পড়ার সাথে ইলেকট্রন নির্গত হওয়ার কারণ দেখাতে গিয়ে বললেন, যেহেতু এই রশ্মি তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ তাই তা শক্তি ধারণ করে এবং সেই শক্তি ধাতুর পৃষ্ঠের ইলেকট্রনদের মাঝে সঞ্চালিত করে তাদের ছিন্ন হবার ও একইসাথে গতিশীল হবার শক্তি যোগায়।

কিন্তু এক্সপেরিমেন্টটা দেখা যায় বড় বেয়াদব! সে এসব কথা মানতেই চায় না। দেখা গেল, যেকোনো শক্তির একটা বিকিরণ পড়লেই ইলেকট্রন দৌড় মারল – ব্যাপারটা এমন নয়, বরং ইলেকট্রন নির্গত হওয়াটা নির্ভর করছে যে রশ্মি আসছে তার কম্পাংকের উপর। একটা ন্যূনতম কম্পাংকের রশ্মি না পড়লে ইলেকট্রন বের হতেই চায় না। যেমন : লাল আলোর কম্পাংক সবুজের চেয়ে কম। এখন একটা ধাতু যদি সিদ্ধান্ত নেয়, “আমাকে অন্তত সবুজ আলোর সমান কম্পাংক না দিলে আমি ইলেকট্রন ছাড়ব না”, তবে তুমি যদি তার উপর হাজার হাজার ওয়াটের লাল আলো জ্বালিয়েও রাখো, সে কিছুতেই তোমাকে দয়ামায়া করে একটা ইলেকট্রনও দেবে না। কিন্তু আমাদের সনাতন পদার্থবিদ্যা তো বলতে চেয়েছিল, কম্পাংক ফম্পাংক আবার কী? যেকোনো টাইপ রশ্মি যত বেশি করে দেবে তত ইলেকট্রন পাবে। এখন কী উপায়?

উপায় দেখালেন আলবার্ট আইনস্টাইন (Albert Einstein), ১৯০৫ সালে। তিনি জানতেন প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম মতবাদ সম্পর্কে যা পুনর্জীবিত করেছিল নিউটনের আলোক সম্পর্কীয় কণাতত্ত্বকে। কোয়ান্টাম মতবাদ অনুসারে আলো নিরবিচ্ছিন্ন শক্তি নয়, এটা হল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শক্তিকণার সমষ্টি যাদের নাম দেওয়া যায় ফোটন। কোনো ফোটনের থাকে নির্দিষ্ট কম্পাংক, যার দ্বারা তার শক্তি কতটুকু তার ধারণা পাওয়া যায়। যে ফোটনের কম্পাংক বেশি তার শক্তিও হবে বেশি ( E = hf, শক্তি ও f  কম্পাংক নির্দেশকারী, প্ল্যাংকের ধ্রুবক যার মান 6.62606957 × 10-34 m2kg/s)। অর্থাৎ, লাল আলো যে ফোটন দিয়ে তৈরি তার কম্পাংক ও শক্তি – দু’টোই কম সবুজ আলোতে থাকা ফোটনের তুলনায়। ফোটনের এই যে অনন্য বৈশিষ্ট্য, এটাই আমাদের নিয়ে যাবে আলোক তড়িৎ ক্রিয়ার সন্তোষজনক ব্যাখায়।

আইনস্টাইন খুব স্মার্টলি বললেন, একটা ফোটন কোনো ধাতুর পৃষ্ঠ থেকে একটা মাত্র ইলেকট্রন সরানোর যোগ্যতা রাখে যদি ফোটনের ধারণকৃত শক্তি ইলেকট্রনকে ধাতু থেকে মুক্ত করার জন্য যথেষ্ট হয়। ঐ যে লাল আর সবুজ আলোর উদাহরণ দিয়েছিলাম, সেটার ব্যাখ্যা তাহলে হবে – লাল ফোটনদের শক্তি নেই ইলেকট্রনদের ধাতবপৃষ্ঠ থেকে সরানোর, কিন্তু সবুজ ফোটনরা সেই ক্ষমতার অধিকারী। তাই লাল ফোটনদের সংখ্যা বাড়িয়ে বা আলোর তীব্রতা বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই কারণ ইলেকট্রনের মুক্তি পাবার ঘটনা কম্পাংকনির্ভর, প্রতিটি ফোটনের শক্তি নির্ভর এবং তীব্রতা বাড়ালে ফোটনগুলোর এসকল প্রপার্টিতে কোনো পরিবর্তনই আসে না। এই জায়গাতেই ধরা খেয়ে গিয়েছে আমাদের সনাতনী পদার্থবিদ্যা কারণ; তীব্রতা বাড়ানোর ফলে অধিক শক্তি প্রদানের মাধ্যমে ইলেকট্রন বের হওয়াই তার কাছে স্বাভাবিক, ফোটন ভিত্তিক কম্পাংক ও শক্তির এই মারপ্যাঁচ সে কি আর জানত?

যদি সবুজ আলোর চেয়ে আরো বেশি কম্পাংকের নীল আলো দিয়ে আমরা ঐ ধাতবপৃষ্ঠকে আলোকিত করি তাহলে? সহজ, এই নীল আলোর ফোটনদের শক্তি তাহলে সবুজ ফোটনদের চেয়েও বেশি, যার কারণে এরা কেবল ইলেকট্রন মুক্ত করেই তাদের কর্তব্য শেষ বলে মনে করবে না। এক্সট্রা শক্তিটুকু তারা ইলেকট্রনকে গতিশক্তিস্বরূপ উপহার দেবে। মুক্তির আনন্দের সাথে উপরি গতিশক্তি পেয়ে খুশির চোটে ফটোইলেকট্রনের সে কি দৌড় 😀

একটু একটু ফিল হয়ত হচ্ছে – এই ধাতুর জন্য সবুজ আলোর ফোটন একটা স্ট্যান্ডার্ড, এর কম্পাংকের চেয়ে কম কম্পাংকের কেউ ধাতুতে আলোক তড়িৎ ক্রিয়া ঘটাতে পারে না। ফোটনের যে ন্যূনতম কম্পাংকের জন্য কোনো ধাতুর ইলেকট্রন তার পৃষ্ঠ থেকে কেবল মুক্ত (গতিশক্তি থাকবে না) হতে পারে সেটাকেই সূচন কম্পাংক (ƒ0, Threshold Potential) বলে (অর্থাৎ এই পয়েন্ট থেকেই ইলেকট্রন মুক্ত হওয়া শুরু হচ্ছে)। সূচন কম্পাংকযুক্ত ফোটনের শক্তিকে বলে কার্যাপেক্ষক ( ϕ = 0, Work Function)। আইনস্টাইন বললেন, ফটোইলেকট্রনের সর্বোচ্চ গতিশক্তি KmaxE − ϕ যেখানে E হচ্ছে আপতিত ফোটনের মোট শক্তি।

এতক্ষণে বুঝে ফেলা উচিত, এটা শক্তির সংরক্ষণ সূত্রের একটা উদাহরণ মাত্র 😛