Reading Time: 1 minute

ডুব পানিতে দিল যখন

খাবার লবণটা;

ডুকরে কেঁদে বলে বালি,

“মিশতে পারি না।” 😥

কাঁদন দেখে হাসে যে তেল,

“ও বালি, তুই ভাগ!

মিশেও আমি খাই না ক মিশ,

লাইফই আমার ঠাগ” 😎

জ্বী হ্যাঁ, এটা বাংলার ক্লাস নয়। তবে রসায়নের রসকথনে খানিক কাব্যরস যোগ করলেও যে মন্দ হয় না তা তো দেখছই 😉 এ পর্বে আমরা এরকম হালকা মেজাজেই ক্যামেস্ট্রি কীর্তন করে যাব 😛 আজ আমাদের বিষয়বস্তু হতে যাচ্ছে মিশ্রণ তথা Mixture.

মৌলিক কিংবা যৌগিক পদার্থ কী তা আমরা সবাই চিনি। ছোটকালে কত যত্ন করে এদের পার্থক্য শেখা হত তা পাঠকহৃদয়ে একবারও কি হানা দিয়ে যায় না? এদের সাথে সাথেই আমরা মিশ্রণ নামের আরেকটা জিনিস পড়ার চেষ্টা করতাম। মিশ্রণ বলতে বোঝানো হত একাধিক পদার্থের (মৌল বা যৌগ) মিশেলে তৈরি এমন এক অবস্থা যেখানে মিশ্রণ তৈরিকারী পদার্থগুলো বিক্রিয়া করে ফেলবে না, অর্থাৎ তারা রাসায়নিক সংযুক্তি ও ভরে একই রকম থাকবে। ঠিক যেমন পানিতে বালি ছেড়ে দিলে যা হয়, বালি বিক্রিয়া করে ফেলে না পানির সাথে বরং তারা পাশাপাশিই আলাদাভাবে থাকে। একে আমরা বলি বালি-পানির মিশ্রণ।

মিশ্রণ হবে ভাল কথা। তবে এই মিশ্রণেরও আছে প্রকারভেদ। মিশ্রণ হতে পারে সমসত্ত্ব (Homogeneous)  অথবা অসমসত্ত্ব (Heterogeneous)। এই দু’টো শব্দও আমাদের কাছে অপরিচিত নয়। সমসত্ত্ব বলতে আমরা বুঝি নিয়মিত বা সমভাবে ছড়িয়ে আছে এমন। সমসত্ত্ব মিশ্রণে যে পদার্থগুলো থাকে তারা একে অপরের সাথে এত সুন্দরভাবে মিশ খেয়ে যায় যে এদের আলাদা আলাদা অস্তিস্ত্ব আমরা খালি চোখে কেন, মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখেও টের পাব না। পানির মধ্যে চিনি বা লবণ গুলে দিলে যা হয় তা এই সমসত্ত্ব মিশ্রণ ছাড়া আর কিছু নয়। বোঝাই যাচ্ছে, অসমসত্ত্ব কোনো কিছু হবে এখানে যা যা বলা হল ঠিক তাদের বিপরীত। বালি আর পানির ঐ মিশ্রণটা তাই আদতে একটা অসমসত্ত্ব মিশ্রণ।

আপাতত তাহলে মিশ্রণকে দু’টো ভাগে ভাগ করা গেল :1মজার ব্যাপার হল, সমসত্ত্ব মিশ্রণকে একটা গ্লাসে নিয়ে যদি আমরা এক পাশ থেকে টর্চ দিয়ে আলো মারি তবে আমরা একেবারে স্বচ্ছ একটা মিশ্রণই দেখব কেবল। আলোকরশ্মি কোন পথে যাচ্ছে এটা বোঝাই যাবে না কেননা মিশ্রণে থাকা অণুগুলো এত ছোট যে তারা আলোকে তার পথ থেকে বিচ্যুত (scatter) করতে পারে না, ফলশ্রুতিতে আলো তার মতই যেতে থাকে। খাবার লবণ আর পানির মিশ্রণে আলো মারলে তাই এরকম ঘটনা ঘটাই স্বাভাবিক :

IMG_20151219_031310

আহ কি সুন্দর ^_^ জাতি অবশ্য এমনটাই আশা করেছিল 😛

সমসত্ত্ব এমন মিশ্রণ, যাতে আলোকরশ্মির পথের কোনো পরিবর্তন হয় না তাকেই আমরা দ্রবণ (Solution) বলি। একটা দ্রবণে থাকে দ্রব (Solute) আর দ্রাবক (Solvent)। সাধারণত এরূপ মিশ্রণে যে পদার্থ কম পরিমাণে থাকে (আমরা বলি, যা দ্রবীভূত হয়) তাকে দ্রব; আর যা বেশি পরিমাণে থাকে (আমরা বলি, যাতে দ্রবীভূত হয়) তাকে দ্রাবক বলে। দ্রবণে থাকে কেবল অণু, পরমাণু আর আয়ন – যাদের আকার কখনোই ১ ন্যানোমিটার ( ১ মিলিমিটারের ১০ লক্ষ ভাগের এক ভাগ) এর চেয়ে বড় হয় না।

অন্যদিকে, অসমসত্ত্ব মিশ্রণে, যেমন ধরা যাক বালি আর পানির মিশ্রণে, আলো প্রবেশ করালে মিশ্রণটি অস্বচ্ছ দেখায়। এটার কারণ বালি (ভ্রমণরত কণা) পানিতে দ্রবীভূত হয়ে যায় না দ্রবণের মত। এরা ভেসে বেড়ায় পানিতে (ঐ কণাগুলোর বিক্ষিপ্তভাবে চলার মাধ্যম) আর আলো এসে পড়লে কণাগুলো বড় হবার কারণে আলোকরশ্মির বিচ্যুতি ঘটায়, যার দরুণ আমরা ঐ মিশ্রণে আলোর চলার পথ দেখতে পারি। আমি এই মিশ্রণের ছবি তুলে এমনটা দেখতে পেলাম :

IMG_20151219_032144

আলো মিশ্রণে ঢোকার পথেই ব্যাপক বিচ্যুতির কারণে জায়গাটা ঘোলা হয়ে গেছে। আলোর উৎস মিশ্রণ দিয়ে ব্লক করেও বোঝা যাচ্ছে আলোটা কোন দিক থেকে আসছে। তার মানে আমরা আলোর পথ শনাক্ত করতে পারছি। এক গ্লাস দুধ নিয়েও এমনটা করে দেখতে পারো।

মিশ্রণে থাকা কণাগুলো দ্বারা আলোকরশ্মির এই যে বিচ্যুতি ঘটা – এটাকে বলা হয় টিন্ডাল প্রভাব (Tyndall Effect)। মিশ্রণে ভ্রাম্যমাণ কণাগুলো যদি তলানি আকারে নিচে পড়ে যায় একটা সময় পর (পানি-বালির কথা স্মর্তব্য), তবে কিন্তু এই টিন্ডাল প্রভাব আর দৃশ্যমান হবে না। এ ধরণের মিশ্রণকে আমরা ডাকি সাসপেনশন (Suspension)। সাসপেনশনে ভ্রাম্যমাণ কণাগুলো সাধারণত ১০০০ ন্যানোমিটার বা ১ মাইক্রোমিটারের অধিক হয়ে থাকে। সাসপেনশনে সৃষ্টিকারী পদার্থগুলো খুব সহজেই আলাদা করা যায় (যেমন : ছাঁকন বা Filtration অথবা মিশ্রণ স্থির রেখে তলানি জমা করা), যেটা দ্রবণের ক্ষেত্রে হয় না। সাসপেনশনের আরো উদাহরণ হল আমাদের বহুল ব্যবহৃত এন্টাসিড, যা আসলে পানিতে অদ্রবণীয় ম্যাগনেশিয়াম হাইড্রক্সাইডের মিশ্রণ। এমনকি সেল কালচারের (Cell Culture) সময় আমরা যে মিডিয়ায় রেখে কোষ বিভাজন ঘটাই ও কোষের সংখ্যাবৃদ্ধি করি – কোষসহ ঐ মিডিয়াকেও সেল সাসপেনশন বলা যাবে।

 

1

এতদূর নাহয় সবই বুঝলাম। প্রশ্ন হল অসমসত্ত্ব মিশ্রণ যদি যুগের পর যুগ এমন ঘোলাই থেকে যায়? তাতে যদি কখনো তলানি না পড়ে তখন? এমন মিশ্রণ পাওয়া কি পাওয়া সম্ভব যাতে তুলনামূলক বড় কণাসমূহ দ্রবণের মতই সমসত্ত্ব অবস্থায় মিশ্রণে বিচরণ করে বেড়াবে আবার অসমসত্ত্ব মিশ্রণের মত টিন্ডাল ইফেক্ট প্রদর্শন করে যাবে দিনের পর দিন?!?

1

উত্তর হবে, হ্যাঁ। এমন মিশ্রণ আসলে পাওয়া শুধু সম্ভবই নয়, আমাদের আশাপাশে এরা রীতিমত ঘুরঘুর করছে। আমরা এমন মিশ্রণকে নাম দিই কলয়েড (Colloid)। হ্যাঁ, এই সেই কলয়েড যার ব্যাপারে স্কুল কলেজে জানতে গিয়ে আমরা বার বার বিমুখ হয়ে ফিরে এসেছি এবং পরবর্তীতে নাম শোনামাত্রই আতংকে ভুগেছি 😛

কলয়েডে থাকা ঘুরে বেড়ানো কণাগুলোর আকার হয় দ্রবণ আর সাসপেনশনের ভ্রমণরত কণাগুলোর সাইজের ঠিক মাঝামাঝি, ১ থেকে ১০০০ ন্যানোমিটারের। একটা কথা পরিষ্কার হয়ে নেওয়া ভাল (নইলে পরে গন্ডগোল বাধার সুযোগ আছে) কলয়েড দ্রবণ আর সাসপেনশনের মধ্যবর্তী একটা কিছু হলেও এর সাথে সাসপেনশনের মিলই বেশি। তাই অনেকক্ষেত্রে একে কলয়ডাল সাসপেনশন বলা হয়। ঐ অমর সেন্টেন্স প্যাটার্নের সুরে তাই বলতে হয় – সব কলয়েডই সাসপেনশন কিন্তু সব সাসপেনশন কলয়েড নয়।

এমতাবস্থায় প্রশ্ন আসতে পারে, কলয়েডের বিক্ষিপ্ত কণাগুলো কীভাবে সমসত্ত্ব ভাব বজায় রাখতে পারে? এর পেছনে কাজ করে ব্রাউনীয় গতি (Brownian Motion) যার নাম হয়ত তোমরা শুনেছ। ব্রাউনীয় গতি হল কোনো মিশ্রণে মাধ্যম হিসেবে যে কাজ করে তার অণুগুলোর সাথে ঘুরে বেড়ানো বড় কণাগুলোর সংঘর্ষের ফলে ঐ কণাগুলোর এদিক ওদিক লক্ষ্যহীনভাবে ছুটোছুটি করতে থাকা। এই কণাগুলো খুব বড় হয়ে গেলে মাধ্যমের অণু সংঘর্ষ ঘটিয়ে এদের মাধ্যমে ঘুরে বেড়াতে আর বাধ্য করতে পারে না, ফলে কণাগুলো তলানি আকারে পড়ে যায় আর মিশ্রণটি কলয়েড না হয়ে কেবলই সাসপেনশনে রূপ নেয়।

কলয়েডের একটা ভাল উদাহরণ টানা যাক আমাদের সেই কবিতার বিশিষ্ট ঠাগ তেলের মাধ্যমে। এই তেল আমাদের বলেছে সে নাকি পানির সাথে মিশ খেয়েও মিশ খায় না (কি ভয়ানক কথা!) 😯 তরল তরল এই অসমসত্ত্ব মিশ্রণের নাম দেওয়া হয় ইমালশন (Emulsion)। আসল ব্যাপারটা তদন্ত করলে দেখা যায় পানিতে তেল ঢেলে দিয়ে চামচযোগে ভালমত নাড়ানোর পরও কিছুক্ষণের মধ্যেই তেল পানি থেকে আলাদা হয়ে উপরে ভাসে :/ এটা তাহলে কলয়েড না হয়ে খাঁটি সাসপেনশনই তো হওয়া উচিত, তাই নয় কি? তবে মজার কথা হল ইমালসিফায়ার (Emulsifier) নামে কিছু পদার্থ আছে যারা তেল এবং পানিকে মিশ খাওয়াতে পারে (অসমসত্ত্ব মিশ্রণকে সাসপেনশনের মত না হতে দিয়ে কলয়েড আকারে রাখা) 😀 সাবান কিংবা ডিটারজেন্ট হল এমন ইমালসিফায়ারের উদাহরণ। তেল ভাসতে থাকা পানিতে তুমি কিছু সাবান যোগ করলেই দেখবে তারা বেশ সুন্দর করে একীভূত হওয়া শুরু করে এবং ঘোলা এই কলয়েড বেশ স্থায়ীও হয়। এমন আরেকটা ব্যবহারিক উদাহরণ হল নিত্য ব্যবহার্য মেয়নিজ (Mayonnaise), যিনি নিজেও তেল আর পানির কলয়েড। তবে এখানে ইমালসিফায়ার কে? কে আবার, ডিমের সাদা অংশ 😉

রকমফের থাকায় কলয়েডের নানা রকম নাম আছে, যেসকল নাম প্রায়ই আমাদের কানে আসে কিন্তু শব্দগুলো প্রকৃত অর্থে কী বোঝায় তা আমরা জানি না।

মাধ্যমের (Dispersion Medium) ভৌত অবস্থা বিক্ষিপ্তভাবে ভ্রাম্যমান কণার (Dispersion State) দশা কলয়েডের নাম উদাহরণ
গ্যাসীয় কঠিন অ্যারোসল (Aerosol) ধোঁয়া, ধুলাবালি
গ্যাসীয় তরল অ্যারোসল (Aerosol) কুয়াশা, মেঘ, মশা মারার স্প্রে
তরল কঠিন সল (Sol) পেইন্ট, গাম, কোষের প্রোটোপ্লাজম
তরল তরল ইমালশন

(Emulsion)

দুধ*, মেয়নিজ
তরল গ্যাস ফোম

(Foam)

সাবানের ফেনা
কঠিন তরল জেল (Gel) জ্যাম, জেলি, মাখন

দুধকে তারকাচিহ্নিত করার কারণ আমরা বহু আগেই কলয়েড না চিনেও একে টিন্ডাল প্রভাবের পরীক্ষায় উল্লেখ করেছিলাম। এই লিস্টের সারাংশের অল্প কিছু মাথায় থাকলেও দুধ খাবার সময় কিংবা গ্রামের কুয়াশাঢাকা রাস্তায় টর্চ জ্বালিয়ে হাঁটার সময় (আবার টিন্ডাল প্রভাবের এক্সপেরিমেন্ট হয়ে যাচ্ছে 😉 ) এদের পেছনের রসায়ন খুঁজে পেয়ে আনন্দ পেতেই পারো তুমি।

 

মিশ্রণ কীর্তনের তবে এখানেই ইতি টানছি 😀