Reading Time: 1 minute

আগের পর্বে আমরা শেষ করেছিলাম সিজারিয়ান বর্ষপঞ্জি নিয়ে কথা বলে। এটিকে বলা যায় আধুনিক খ্রীষ্ট বর্ষপঞ্জির পথে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। আমরা এই পর্বে খ্রীষ্ট বর্ষপঞ্জির ক্রমবিকাশ এবং এর পাশাপাশি বর্ষপঞ্জি সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য জানবো।

 

একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, আমরা তো বর্ষপঞ্জি ব্যবহার করি, কিন্তু এই বর্ষপঞ্জিগুলো শুরু হয়েছিল কবে? পৃথিবী শুরুর দিন কিংবা মানুষের জন্মের প্রথম দিন থেকে নিশ্চিতভাবেই এটি শুরু হয়নি। তাহলে কোন বছরটি আসলে প্রথম বা শূণ্যতম বছর? রোমানরা বর্ষপঞ্জির দিন গণনা শুরু করেছিল Romulus এবং Remus নামক শহরের গোড়াপত্তনের দিন থেকে। বছরটি ছিল বর্তমান খ্রীষ্ট বর্ষপঞ্জি অনুসারে ৭৫৩ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ। একইভাবে অন্যান্য বর্ষপঞ্জিগুলোও এরকম বিভিন্ন স্মরণীয় ঘটনা থেকে দিন গণনা শুরু করে।

আমরা বর্তমানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যে বর্ষপঞ্জিটি ব্যবহার করি, সেটি হল খ্রীষ্ট বর্ষপঞ্জি। এটি শুরু হয়েছিল Jesus Christ-এর জন্মের সাল থেকে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, এটি ৫৩০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত এমন ছিল না। এর আগ পর্যন্ত এর দিন গণনা শুরু হত Diocletian নামের একজন সম্রাটের সাম্রাজ্যলাভের বছর থেকে। ৫৩০ সালে Dionysius Exiguus মত পোষণ করেন যে, Diocletian-এর সাম্রাজ্যলাভের দিন থেকে Jesus Christ-এর জন্ম অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। এবং যেহেতু সেসময় চার্চগুলোর প্রভাব ছিল বেশী, তাই এই মত সহজেই জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়। তখন ছিল সে যুগের ক্যালেন্ডার অনুসারে ২৪৮ সাল। Dionysius সতর্কতার সাথে নির্ণয় করেন যে, এটি ছিল Jesus Christ-এর জন্মের ৫৩২-তম বছর। আর এভাবেই ক্যালেন্ডারের সালগুলোর পূনর্সজ্জা হয়, এবং বর্তমান বর্ষপঞ্জিটি শুরু হয়। এ বর্ষপঞ্জি অনুসারে Christ-এর জন্মের পরের ঘটনাগুলো হল Anni Domini Jesu Christi (সংক্ষেপে AD), এবং এর পূর্বের ঘটনাগুলো হল Before Christ (সংক্ষেপে BC)।

 

তবে বর্তমানে ইতিহাসবিদরা প্রমান করেছেন যে, Dionysius তার হিসেবে ভুল করেছিলেন। এটি প্রমাণিত যে খ্রীষ্টের জন্ম এর চেয়ে অন্তত চার বছর আগে হয়েছিল। কারণ Jesus Christ-এর জন্ম  Herod the Great-এর সময়। আর তিনি যে বছর মৃত্যুবরণ করেছিলেন, সে বছরটি বর্তমান বর্ষপঞ্জি অনুসারে ৪ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ।

 

তবে যাই হোক, এর আর কোনো সংশোধন হয়নি, এবং এটিই বর্তমানে সবচেয়ে বেশী ব্যবহৃত বর্ষপঞ্জি। বর্ষপঞ্জি কোন বছর থেকে শুরু হল, সে সমস্যা সমাধান হল। এবার আমরা ফিরে যাবো সিজারের মাস, বছরের হিসেবে। আগের পর্বে বলা হয়েছে জুলিয়াস সিজার বর্ষপঞ্জির সংশোধন করে কীভাবে সৌর বছরের সাথে সামঞ্জস্য আনেন। এবং সে সাথে চার বছর পর পর অধিবর্ষ হিসেবে এক দিন যোগ করার কথাও বলা হয়েছে। এবং Dionysius যখন খ্রীস্টের জন্মসাল নির্ণয় করে বর্ষপঞ্জির শুরুর বছরটি পরিবর্তন করেন, তখন দেখা গেল কাকতালীয়ভাবে সে বছরটিও অধিবর্ষের মধ্যে পড়ে গেল। এবং এর পর হিসেবগুলোও সহজ হয়ে গেল – যেসব বছর চার দিয়ে ভাগ যায়, সেগুলোই অধিবর্ষ।

 

তবে এই সহজ-সরল হিসেবে সমস্যা থেকেই যায়। এভাবে চারটি বছর মিলে হয় ১৪৬১ দিন, যা চারটি সৌর বছরের চেয়ে ১১ মিনিট ১৫ সেকেন্ড বেশী। এভাবে দেখা গেল ১২৮ বছর পর পর দেখা গেল একটি করে দিন বেড়ে যাচ্ছে। ফলে ঋতুগুলোও ধীরে ধীরে সরে যেতে শুরু করছে। কিন্তু বর্ষপঞ্জি আবারও বদলানো কোনো সহজ কাজ ছিল না, এবং এর দায়িত্বও কেউ নিতে চাইলো না। অতঃপর অনেক পরে Pope Gregory XIII এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেন।

 

এই সংশোধনের তিনটি মূল অংশ নিলঃ

  • Council of Nicaea থেকে Spring Equinox-এর দিন ধার্য করে দেওয়া হয়েছিল মার্চ ২১। কিন্তু ততদিনে এক দিন করে পেছাতে পেছাতে এটি চলে গিয়েছিল মার্চ ৩১-এ।তাই এই সংশোধন অনুযায়ী অক্টোবর ১৫৮২ থেকে ১০ দিন কমিয়ে নেওয়া হল। অক্টোবর ৪ (বৃহস্পতিবার)-এর পরের দিন ছিল অক্টোবর ১৫ (শুক্রবার)। ইতিহাসে অক্টোবর ৫, ১৫৮২ থেকে অক্টোবর ১৪, ১৫৮২-এর কোনো অস্তিত্ব নেই!
  • সৌর বছরের সাথে সমন্বয় সাধনের জন্য প্রতি চার শতাব্দীতে তিনটি করে অধিবর্ষ বাদ দেওয়া হবে। এর পর থেকে নিয়ম হয় যে, যে সব বছর ১০০ দিয়ে ভাগ যায়, কিন্তু ৪০০ দিয়ে ভাগ যায় না, সেগুলো অধিবর্ষ হবে না। এটি অনেক কার্যকর একটি সিদ্ধান্ত ছিল। কারণ এর মাধ্যমে ৪০০ বছর সমান হয়ে গেল ১৪৫০৯৭ দিনের, প্রতি বছরে গড়ে 365.2425 দিন, সৌর বছর থেকে যা মাত্র 26.8 সেকেন্ড করে বেশী। এর ফলে ৩২০০ বছর পর পর একটি করে নতুন দিন বাড়বে। অর্থাৎ ৪৯ শতাব্দী পর্যন্ত আর কোনো সংশোধনের প্রয়োজন নেই!
  • তৃতীয় নিয়মটি ইস্টারের দিন ধারণ নিয়ে। এটি সম্পর্কে আমার খুব বেশী ধারণা নেই, তাই লিখতে পারলাম না।

 

 

download (2)

ইতালি, পোল্যান্ড, স্পেন, পর্তুগাল এই বর্ষপঞ্জি সাথে সাথে মেনে নেয়। ফ্রান্স, বেলজিয়ামে নতুন বর্ষপঞ্জি মেনে নেওয়া হয় ১৫৮২-এর ডিসেম্বরে। মজার ব্যাপার হল, অন্যান্য দেশগুলোও ধীরে ধীরে এর সাথে সমন্বয় করে নিলেও ইংল্যান্ড নেয়নি। এর পেছনে ছিল প্রোটেস্টেন্ট-ক্যাথোলিক বিরোধ। ফলস্বরূপ ইংল্যান্ড পরবর্তী আরো ১৭০ বছর ধরে পুরনো বর্ষপঞ্জি অনুসারে চলতে থাকে।

  • তারা বাকি ইউরোপ থেকে দশ দিন পিছিয়ে ছিল (১৭০০ সাল থেকে ১১ দিন)।
  • তারা নববর্ষ পালন করতো মার্চের ২৫ তারিখ। অর্থাৎ মার্চ ২৪, ১৫৮২ সালের পরের দিন হত মার্চ ২৫, ১৫৮২!
  • ইউরোপে যেসব চিঠি যেত, সেসবে দুইটি তারিখ উল্লেখ থাকতোঃ পুরনো এবং নতুন দুই বর্ষপঞ্জি অনুসারে।

 

 

অবশেষে ১৭৫১ সালে পার্লামেন্ট গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার adoptation-এ সম্মত হয়। ইতোমধ্যে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে তারা ১১ দিন পিছিয়ে গিয়েছিল। তাই তাদের সেপ্টেম্বর ২, ১৭৫২-এর পর এসেছিল সেপ্টেম্বর ১৪, ১৭৫২। একই অ্যাক্টে বলা হয় যে, পরবর্তী বছর থেকে নতুন বছর শুরু হবে জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে। তবে পুরনো ক্যালেন্ডারের ছোয়া এখনো ব্রিটিশদের জীবনে রয়ে গেছে। তাদের Tax Year শেষ হয় এপ্রিল ৫ তারিখে, যা হল মার্চ ২৫ + ১১ দিন!

হিজরী বর্ষপঞ্জি

অনেক জটিল জটিল হিসেব নিকেশ নিয়ে অনেক কথা হল। এবার বলবো এমন একটি বর্ষপঞ্জির কথা যা সৌর বছরের কোনো ধার ধারে না, এবং কোনো জটিল হিসেব-নিকেশেরও যা ধারে-কাছে নেই। বলছি হিজরী বর্ষপঞ্জির কথা, যা নির্ভর করে শুধুমাত্র চাঁদের গতির উপর। হিজরী বর্ষপঞ্জিতে ১২ টি চান্দ্র মাস আছে। এবং এটি মোটামুটিভাবে ৩৫৫ দিন দীর্ঘ হয়। এই বর্ষপঞ্জি অনুসারে প্রতি বছর ঋতুগুলো ১০ বা ১১ দিন করে পেছাতে থাকে। এবং এভাবে এটি সৌর ঋতুগুলোর সাথে ৩৩ বছরের একটি চক্রে আবর্তন করে।

 

প্রতিটি মাস শুরু হয় অর্ধচন্দ্রের পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে। এবং এই পর্যবেক্ষণ অবশ্যই কোনো যোগ্য ব্যক্তির মাধ্যমে ঠিক সন্ধার সময় হতে হয়। কোন সময়ে চাঁদ দেখা যেতে পারে, এটি পূর্ব থেকে অনুমানের চেষ্টা অনেক বছর ধরেই করে যাচ্ছেন অনেকেই। এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ রমজান মাসের জন্য।

_____________________________________________________________________

একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয় নি। কেন বছর  জানুয়ারি থেকে শুরু হয়? আগেই বলা হয়েছে, সিজার পূর্ববর্তী সময়ে বছর শুরু হত মার্চে। জুলিয়াস সিজার পরবর্তীতে এটি জানুয়ারি নির্ধারণ করেন। কারণ জানুয়ারি নামটি এসেছে রোমান দেবতা Janus (God of doorways and beginnings) থেকে। জানুসের ছিল দু’টি মুখ (মুখ বলা ঠিক হবে না, আরও সঠিক শব্দ হবে face)। একটি তাকিয়ে থাকতো অতীতের দিকে, আরেকটি ভবিষ্যতের দিকে।

janus_statue_250

অনেক কথাই বলার চেষ্টা করেছি। তবে চেষ্টা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ ইতিহাস তুলে আনা সম্ভব হয় নি। আগামী পর্বে চেষ্টা করবো আমাদের নিজস্ব বর্ষপঞ্জিটি নিয়ে বলতে।

 

 

 

 

 

 

 

Muntasir Wahed

Muntasir Wahed

System Administrator at স্বশিক্ষা.com
Jack of all trades, master of none.
Muntasir Wahed
Muntasir Wahed