Reading Time: 1 minute

আগের পর্বে ( মৌমাছি [১] – দ্য ড্যান্সিং ম্যাথমেটিশিয়ান আর্কিটেক্ট) মৌমাছির কিছু  অসাধারণ বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তার সূত্র ধরে মৌমাছির বংশ বৃদ্ধির প্রক্রিয়া আলোচিত হবে এবারের পর্বে।

পুরুষ মৌমাছি মোটামুটি বেকার জীবন কাটালেও তাদের জীবনেরও একটা লক্ষ্য আছে। এদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হল রাণী মৌমাছির সাথে মিলন। ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যাক,
এক একটা মৌচাকে প্রায় ১০০’র মত পুরুষ মৌমাছি থাকে। মিলন মৌসুমের প্রতিদিন দুপুরবেলা কোন এলাকার সকল মৌচাকের সকল পুরুষ (সাবালক) সদস্য এলাকার একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ভিড় জমায়, যাকে বলে “পুরুষ ধর্মসভা এলাকা (drone congregation area)”, এর অবস্থান মাটি হতে ১৫-৪০ মিটার। এই ধর্মসভায় কি আলোচনা হয় 😯 ? সেটা পরে দেখব আমরা।
অন্যদিকে কাকতালীয়ভাবে একই সময়ে প্রতিটা মৌচাক থেকে সাবালিকা (৭ দিন মৌমাছি) রাণী মৌমাছি ঘুরতে বের হয়, যার কেতাবি নাম- The Mating Flight ( উল্লেখ্য এই রাণী মৌমাছি কিন্ত ভার্জিন 😯 )। এরপর উড়তে উড়তে রাণী মৌমাছি হটাৎ! 😯 , হ্যা হটাৎ করেই ঢুকে পড়ে পুরুষ ধর্মসভা এলাকায় ( কিভাবে রাণী এ এলাকা খুঁজে পায়, সেটা একটা রহস্য 🙄 )। সে এসেই এক বিশেষ ধরনের গন্ধ (ফেরোমেনন) ছড়িয়ে দেয়, যার ফলে শত শত পুরুষ মৌমাছি’রা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। এবং এরপরই উড়ন্ত অবস্থায় রাণী মৌমাছি পছন্দমত পুরুষের সাথে মিলন করে। পর্যায়ক্রমে ১৮-২০ টা পুরুষ মৌমাছির সাথে মিলন হয় রাণীর। তাহলে বাকি পুরুষগুলোর কি ভাগ্য খারাপ? নাহ 😯 …
অদ্ভুত ব্যাপার হল একটা পুরুষ মৌমাছির মিলনের সময়ে তার এন্ডোফেলাস (যৌনাঙ্গ) কর্মী মৌমাছির হুলের মতই ভেঙ্গে যায় এবং তখনই মারা যায় পুরুষ মৌমাছি। এ জন্য এ মিলন’কে বলে “The Dramatic Sexual Suicide”।

1

বাকি পুরুষ মৌমাছি গুলো পরদিন আবার ধর্মসভা বসায়, অপেক্ষা করে জীবনের লক্ষ্য পুরণের; নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও তারা এ কাজে আত্ম-ত্যাগ করে বংশ টিকিয়ে রাখার জন্য। আসলে সকল প্রাণীই তার বংশ রক্ষায় সর্বাত্মক চেষ্টা করে যায়।
বেশ কিছু পুরুষ মৌমাছি মিলন হতে বঞ্চিত থেকে যায়, বংশরক্ষায় অংশ নিতে পারে না। কারণ তুলনামূলকভাবে পুরুষ মৌমাছি বেশি ( রাণী প্রতি মৌচাকে মাত্র ১টা, পুরুষ ১০০ টা)। মিলন বঞ্চিত হলেও তারা লাইফ সার্টিফিকেট পেয়ে যায়, বেঁচে থাকে শীত মৌসুম পর্যন্ত, মৌচাকের কাঁধের বোঝা হয়ে। শীতে খাবারের টান পড়লে কর্মী মৌমাছি’রা দূর করে দেয় এদের, মৌচাক হতে বনবাসে পাঠানো হয় তাদের। এবং সেখানেই ২-১ দিনের ভেতরে মারা যায়। নির্দয়ের মত একাজটা করে কর্মীরা শুধুমাত্র তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যেই।
উল্লেখ্য যে, রাণী মৌমাছি কিন্তু জীবনে এই একবারই মিলন করে। মিলনের ৩য় দিন থেকে বাকি জীবন (২-৫ বছর) সে এই মিলনের ফসলই ফলায় প্রতিদিন ১৫০০-২৫০০ ডিম পেড়ে। জীবনের শেষে তার পাড়া ডিমের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩-৪ মিলিয়ন 😯 । এভাবে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে মৌচাকের বিস্তৃতি।

শীতকালে রাণী ডিম পাড়ে না, কেননা তখন শীতের প্রকোপে বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ে। গ্রীষ্মে পুরোদমে ডিম পাড়ে রাণী। বেশি ডিম পাড়ার ফলে তখন অন্য একটি সমস্যা দেখা দেয়। বেশি ডিমের সাথে সাথে বেশি মৌমাছি, সাথে সাথে গ্যাঞ্জামও বাড়ে 😡 , মৌচাকও বড় হতে থাকে। বেশি গ্যাঞ্জামের মধ্যে মৌচাকে নিয়ম-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ও স্বাভাবিক আচরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় নতুন মৌচাকের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু কলুর বলদ কর্মী মৌমাছিরা এই প্রয়োজনের কথা জানতে পাড়ে কিভাবে?
আসলে রাণী মৌমাছি সবসময়ে বিশেষ ধরনের ফেরোমেনন ছড়ায়, কর্মীরা এর মাধ্যমেই রাণীর উপস্থিতি টের পায়। কিন্তু মৌচাক বেশি বড় হয়ে গেলে রাণীর ফেরোমেনন সকল কর্মী পর্যন্ত পৌঁছায় না। তখন দূরে থাকা কর্মীরা ধরে নেয়, তাদের রানী আর নেই! 😯 । তাই কর্মী মৌমাছিরা তখন নতুন রাণী মৌমাছি বানানোর জন্য বিশেষভাবে তৈরি কুঠুরী (cell) বানায়। রাণী মৌমাছি এই বিশেষভাবে বানানো কুঠুরিতে নিষিক্ত ডিম পাড়ে।
কর্মী মৌমাছিরা এই বিশেষ ডিম গুলো থেকে বেরোনো লার্ভাদের জন্মের পর থেকেই পূর্ণ-বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত এক বিশেষ ধরনের তরল খাওয়ায় – যার নাম রয়েল জেলী। এই রয়েল জেলী দুধের ন্যায় সাদা বস্তু, যা উৎপন্ন হয় কর্মী মৌমাছির মাথা’র মগজ থেকে। এই রয়েল জেলী শুধু যে মৌমাছির জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তা নয়, মানব জীবনে অন্যান্য প্রাণীর জীবনেও মৌমাছির রয়েল জেলী’র বিশেষ ভূমিকা রয়েছে; আছে বেশ কিছু যুগান্তকারী সম্ভাবনা। রয়েল জেলী নিয়ে বিস্তারিত থাকবে আগামী পর্বে।
এখানে উল্লেখ্য যে, নিষিক্ত ডিম হতে উৎপন্ন কর্মী মৌমাছি’দেরও  রয়েল জেলী খাওয়ানো হয়; তবে খাওয়ানো হয় মাত্র ৩ দিন। এরপর তাদের স্বাভাবিক খাবারই (মধু,রেনু ইত্যাদি) খাওয়ানো হয়। [খাওয়ানোর ছবি]

                                                           0,,16779230_303,00
অনাকাঙ্খিত কারণেও যদি কোন রাণী মৌমাছি মারা যায়, তবে ১৫ মিনিটের মধ্যে সকল কর্মী মৌমাছি সে খবর পেয়ে যায়। এবং স্বপ্রণোদিতভাবে নতুন রাণী মৌমাছি বানানোর উদ্যোগ নেয়।
যাই হোক রয়েল জেলী খেয়ে খেয়ে রাজকীয় ভাবে বেড়ে ওঠে আগামী দিনের সম্ভাব্য রাণী। অন্যদিকে নতুন রাণী কে জায়গা ছেড়ে দিতে পুরনো রাণী বেশ কিছু কর্মী মৌমাছি সাথে করে মৌচাক ছেড়ে চলে যায়। কারণ, একটা মৌচাকে একটাই রাণী থাকতে পারে।
পুরনো রাণী এরপর কোথায় যায়? সে তার দল-বল সহ নতুন মৌচাক এর জন্য খোঁজ করতে থাকে। রাণী মৌমাছি’র যাতে কোন ক্ষতি হতে না পারে, সে জন্য সকল কর্মী মৌমাছি মিলে তাকে ঘিরে রাখে। এই দৃশ্য হয়ত আমরা অনেকেই দেখেছি (নিচের ছবির মত করে),

                                                                      273xNxSWARM-300.jpg.pagespeed.ic.kXATiytxBc
মূলত পুরো দল খুব একটা ঘোরা-ঘুরি করে না, তারা কোন গাছের ডালে আশ্রয় নেয়। খোঁজার জন্য দলের কিছু কর্মী স্কাউট হিসেবে ঘুড়ে বেড়ায়। এবং ভাল কোন জায়গা পেলে এসে খবর দেয়। তারপর সকলে মিলে নতুন জায়গায় আবার শুরু করে নতুন জীবন। আবার শুরু হয় নতুন করে মৌচাক তৈরি, জন্মায় নতুন নতুন পুরুষ, কর্মী মৌমাছি।

অন্যদিকে আগের মৌচাকে নতুন রাণী মৌমাছি ৮ দিনের মাথায় বেরিয়ে আসে কুঠুরি (cell) থেকে। নিচে ছবি ( এ ছবি সকল মৌমাছির জন্যই প্রযোজ্য, সকলেই এভাবে প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে ওঠে) :

                                                    1

এরপর নতুন রাণী মৌমাছি হয়ত কিছু কর্মীকে সঙ্গে করে নতুন কোন উপযুক্ত জায়গার খোঁজে বেরিয়ে পড়ে, যেখানে নতুন মৌচাক বানানো যায়। অথবা, আগের মৌচাকেই থাকে, কিন্তু কিছু বিশেষ ডিম, লার্ভা (যেগুলোর ভবিষ্যতে রানী হওয়ার কথা) ধংস করে দেয়। যাতে নতুন কেউ রাণী হতে না পারে।
প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর নতুন মৌমাছি বের হয় জীবনের প্রথম এবং হয়ত শেষ মিলন এর জন্য, অসংখ্য পুরুষ মৌমাছির ভাগ্য নির্ধারণ করতে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বীজ ধারণ করতে। এভাবেই চলতে থাকে বছরের পর বছর, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম।
পৃথিবীর পতঙ্গ- পরাগায়নের ৯০ ভাগই মৌমাছির অবদান। এরা না থাকলে কত উদ্ভিদ হারিয়ে যেত কালের গর্ভে। উদ্ভিদের ফলন হত কম। আমেরিকান গবেষণায় দেখা যায়, মৌমাছির পরাগায়নের কারণে শুধু আমেরিকাতেই প্রতি বছর ৩২ বিলিয়ন ডলার মুল্যের ফসল বেশি ফলে 😯 (বাংলাদেশের সম্পূর্ণ বাজেট ৩৭ বিলিয়ন ডলার 🙁 )।
মৌমাছির শীত মৌসুম টিকে থাকার জন্যই মূলত মধু তৈরি করে। তবে বেশি সিরিয়াস বলে এরা প্রয়োজনের চেয়ে প্রায় দ্বিগুন মধু তৈরি করে। তাও শান্তি নেই এদের, এখানেও বাগড়া দেয় আমেরিকা। এদের উৎপন্ন মধু’র প্রধান খোরাক আমেরিকান’রা; এরা বছরে ২৮৫ মিলিয়ন পাউন্ড মধু চুষে খায়।

মধু যেই চুষুক না কেন, এর জন্য ক্রেডিট মৌমাছিকেই দিতে হবে।  মৌমাছি নিয়ে এই টুকুই…

আগামী পর্বে আমরা মৌমাছির মধু ও রয়্যাল জেলী নিয়ে আলোচনা করব, দেখব এদের অপার প্রয়োগ ও সম্ভাবনা।

%d bloggers like this: