Reading Time: 1 minute

“আমি তোমায় ভালবাসি”- নিপীড়কের জবানবন্দী

আচ্ছা, আপনার কি কখনো এমন মনে হয়েছে- যে মানুষটি তার সমগ্র অস্তিত্ব উজাড় করে এক মুহুর্তে বলছে “ভালোবাসি তোমায়”, ঠিক পরের মুহূর্তেই কিভাবে সে বলে, “হারামজাদী, লাত্থি দিয়ে তোর কোমর দুই টুকরা করে দিব?”

আপনি যদি একজন স্বাভাবিক মানুষ হন, এ প্রশ্নটি আপনার মাথায় ঘুরপাক খাবে নিশ্চিত। প্রেম করে বিয়ে করেছেন, একজন অন্যজনকে না দেখে এক মুহূর্ত থাকতে পারতেন না- সেই মানুষটাই মাসের ২৯ দিন আপনাকে অকথ্য ভাষায় গালি দেয়, আপনার বাবা মা কে নিয়ে নোংরা কথা বলে, গায়েও হাত তোলে আপনার।বাকি এক দিন সে আপনাকে রাজকুমারীর মত আদর করে, যে এক দিনের সুখ আপনার বাকি উনত্রিশ দিনের বঞ্চনা ভুলিয়ে দেয়- আপনি আষ্টেপৃষ্ঠে বাধা পড়েন নিপীড়কের মায়াজালে। দুর্ব্যবহার প্রতিরোধের যে ইচ্ছেটুকু আপনার উদয় হয়েছিল, ওই একদিনের আদর পেয়ে তা গলে বরফ হয়ে যায় বারবার। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে আপনার মনের দৃঢ়তাটুকু মুছে যায়, নিপীড়ক আবার সেই একই চক্র চালু করে (যার বর্ণনা প্রথম পর্বে বলেছি)।সেই থোড় বড়ি খাড়া খাড়া বড়ি থোড়…এ যেন এক অবিচ্ছেদ্য চক্র, মৃত্যু ছাড়া যার কোন মুক্তি নেই।

আসলেই কি তাই?

না।

আপনার নিপীড়নকারী একজন মানসিকভাবে অসুস্থ্য ব্যক্তি, সে আপনার আমার ভাষায় কথা বলেনা। সে যা বলে , তার প্রতিটা কথার একটা অন্তর্নিহিত অর্থ থাকে। আজ এই অন্তর্নিহিত অর্থ আপনাকে বলে দেব, যাতে আপনার মস্তিষ্ক সহজেই চিনে নিতে পারে নিপীড়কের কূটকৌশল।

ছলনা

ছলনা

মুখে বলা কথাঃ‬ এক

“আমি এই পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে তোমাকে সবচাইতে বেশি ভালবাসি”

আসল অর্থঃ

আমি চাই তুমি বিশ্বাস করো যে আমি তোমাকে ভালোবাসি। কারণ, তাহলে তুমি আমাকে গ্রহণ করবে এবং আমার ব্যবহারকে মেনে নেবে। আমি চাই তুমি আমার প্রেমে একেবারে হাবুডুবু খাও, প্রেমের সাগরে তোমার দিন দুনিয়া এক হয়ে যাক যত দ্রুত সম্ভব। যত তাড়াতাড়ি এইটা হবে, তত তাড়াতাড়ি আমি ভালোমানুষের মুখোশ সরিয়ে ফেলে আরামসে আমার আসল রূপ তোমাকে দেখাতে পারব। ভালোমানুষের মুখোশ বজায় রাখাটা আমার জন্য কঠিন, বিশেষ করে যদি তা লম্বা সময়ের জন্যে হয়। এই কঠিন কাজটা আমি করতে চাইনা, তাই তোমাকে পটাতে আমি ডাবল চেষ্টা করব। তুমি যা শুনতে চাও তোমাকে আমি ঠিক তা-ই শোনাব, ছোট ছোট উপহার আর মিষ্টি কথায় ভরিয়ে দেব তোমাকে। যখন তুমি প্রেমে হাবুডুবু খাবে, আস্তে আস্তে আমি তোমাকে আমার পরবর্তী আচরণের জন্যে অভ্যেস করিয়ে নেব- দক্ষ শিক্ষক যেভাবে ছাত্রকে সহজ থেকে কঠিন বিষয়ে ছাত্রকে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করে নেয়। যতদিনে তুমি আমার প্রেমে পুরোপুরি হাবুডুবু খাচ্ছ, ততদিনে তোমার উপর ফুল কন্ট্রোল আমি নিয়ে নিয়েছি!

মুখে বলা কথাঃ দুই

“আমি তোমাকে ভালবাসি। আমি শুধু তোমাকে নিয়েই সন্তুষ্ট, তুমি-ই আমার সব। তোমারও উচিত একমাত্র আমি ছাড়া বাকি সবকিছু ছেড়ে দেয়া”

আসল অর্থঃ

খবরদার, এই যে তোমাকে আমি নিপীড়ণ করি, এজন্যে কিন্তু আমাকে দোষ দিতে পারবেনা। আমি এরকম করি কারণ অন্য মানুষ আমাদের সম্পর্কে নাক গলাক এটা আমি চাই না। তোমাকে তোমার বন্ধুবান্ধবদের ছেড়ে দিতে হবে, সম্ভব হলে পরিবারকেও। তোমার চাকুরি করার দরকার নেই, ওখানে বাইরের লোক আছে যারা চাইবে আমার কাছ থেকে তোমাকে দূরে সরিয়ে দিতে। তোমার কোন শখ, সাধ আহ্লাদ থাকা যাবেনা। আমি ছাড়া পৃথিবীর অন্য কিছুতে তুমি তোমার সময় , শ্রম আর শক্তি খরচ করতে পারবেনা। কেন আমি তোমার জন্যে যথেষ্ট নই? তোমার পৃথিবীর আমিই কেন্দ্র, যত দ্রুত এটা মেনে নেবে ততই ভালো। বোঝা গেল?

মুখে বলা কথাঃ‬ তিন

“আমি তোমাকে ভালবাসি। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না”

আসল অর্থঃ

তুমি আমার জন্যে যা যা করো, আমি সেগুলো ভালবাসি। তুমি চলে গেলে আমার ঘরবাড়ি পরিষ্কার করবে কে, আমার শার্ট ইস্ত্রি করবে কে, আমার জন্য রান্না করবে কে, আমার যৌনচাহিদাই বা কে মেটাবে? টাকাপয়সা যখন সব মদ আর অন্য মেয়ের পেছনে খরচ করে শেষ করেছি, তুমি চলে গেলে কে এই অবস্থা থেকে আমাকে বাঁচাবে? তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে আমার নিজেকে ক্ষমতাবান মনে হয়, সত্যিকারের ব্যাটাচ্ছেলে বলে মনে হয়। তুমি আমাকে মনে করিয়ে দাও আমি ক্ষমতাবান, কারণ তোমাকে আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। তোমাকে বহু কষ্টে পোষ মানিয়েছি, তুমি চলে গেলে আবার আমাকে নতুন শিকার খুঁজতে হবে, তার পেছনে সময় দিতে হবে-তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে বাগে আনতে হবে।এত কষ্ট কে করে? তোমাকে ধরে রাখতে ন্যুনতম যেটুকু কষ্ট করা লাগে তা আমি করব, প্রয়োজনে অল্প সময়ের জন্য কিছুটা ভালো ব্যবহারও করব। আমাকে ছেড়ে যেও না, প্লিজ!

প্রিয় পাঠক/পাঠিকা,

নিপীড়কের মনের কথা তো দেখিয়ে দিলাম। এবার আপনার জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রশ্ন আছেঃ
আপনি কি আসলেই তাকে ভালবাসেন? এই যে সারাজীবন ধরে শারীরিক আর মানসিক অত্যাচার সহ্য করছেন- ভালবাসার মধু কি এই কষ্টটাকে মুছে দিচ্ছে?

আমরা যখন নিপীড়নমূলক সম্পর্কের ভেতরে থাকি, প্রায়ই আমাদের মস্তিষ্ক উদগ্রভাবে আমাদেরকে বলে- “আমি ওকে ভালবাসি, যা করছি ভালবেসে করছি”।

এই আর্টিকেলের মূল লেখিকার মতে( যেটা আমিও বিশ্বাস করি), একজন নিপীড়নকারীকে সত্যিকারভাবে ভালবাসা অসম্ভব।ভালবাসা হচ্ছে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ , ভালবাসা হচ্ছে সমতা। আরও জরুরী কথা, ভালবাসা নিপীড়ন নয়। তবে জেনে রাখা প্রয়োজন, নিপীড়নমূলক বন্ধন কিন্তু ভালবাসার কাছাকাছি বলে ভুল হতে পারে।

আপনি যদি নিশ্চিত না হন, এই ছোট্ট এক্সারসাইজটি করুন।

আপনার সঙ্গীর বর্তমান রূপটি( মানে এখন সে আপনাকে যে রূপ দেখাচ্ছে) কল্পনা করুন। এই যে মানুষটা আপনাকে এখন প্রতিদিন নির্যাতন করে, শুরুর ভালমানুষির মুখোশটুকু ছাড়া যদি এভাবেই আপনার সাথে তার পরিচয় হত, আপনি কি তার সাথে সম্পর্কে জড়াতেন?

উত্তর যদি হয় “না”, তাহলে তার ভালমানুষির স্মৃতিটুকু ডাস্টবিনে ফেলে দিন- ওটা মেকী ছিল।
আপনার নিপীড়ক যখন বলছে সে আপনাকে ভালবাসে, তার মাথায় আসলে একটাই চিন্তাঃ কিভাবে আপনাকে কৌশনে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ও ভালবাসতে পারে কি পারেনা তা জরুরী নয়, সত্যিটা হচ্ছে- আপনি কোনভাবেই তাকে পাল্টাতে পারবেন না।

গত পাঁচ বছর ধরে আপনাকে কেউ নিপীড়ন করেছে মানে এই না যে আগামী পাঁচ বছর ধরেও সে এই কাজ করার অধিকার রাখে| নিপীড়ক কখনও পাল্টায় না, পাল্টাতে হয় নিপীড়িতকেই| তিলে তিলে অপমান আর নির্যাতন সহ্য করা নিরীহ মেয়েটাকে অথবা গার্লফ্রেন্ডের এ্যাবিউজ সহ্য করা সাদাসিধে ছেলেটাকেও একদিন রুদ্রমূর্তি ধারণ করে চিৎকার করে বলতে হয়, “শুওরের বাচ্চা, পেয়েছিস কি তুই?”

বছরের পর বছর সমাজের “মেনে নেবার” চর্চা দূর করে এই কনসেপ্টগুলো আপনি রাতারাতি হজম করে ফেলবেন, এই আশা আমি করিনা।আমার নিজেরই হজম করতে খুব কষ্ট হয়েছে- এতটাই বীভৎস রকমের কমন এই ঘটনাগুলো।

শয়তানের শিরদাঁড়া ভেঙে দিতে হলে ঠিক কোন জায়গায় শাবল দিয়ে ঘাই মারতে হবে সেটা খুব ভালোভাবে চিনতে হবে, নইলে সব শ্রম পণ্ড। এ পর্বটির সাথে আগের দুটো পর্ব সময় করে অল্প অল্প পড়ে নিন, সাথে থাকুন আমার।যথাসময়ে আমার সাধ্যমত এর সমাধান আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চেষ্টা করব।

Let there be light!

সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ‬

এই লেখাটা নিপীড়ন নিয়ে, প্রেম নিয়ে নয়। চকলেটের লোভ দেখিয়ে বাবা মা সন্তানকে আদর করেন, আর শিশুনির্যাতক করে নির্যাতন। আপনি প্রেম না নিপীড়ণের শিকার এটা বুঝতে দয়া করে কমন সেন্স ব্যবহার করুন। ধন্যবাদ।