Reading Time: 1 minute

।। ইম্পোস্টার সিনড্রোম ।।

বেশ ভালো একটা কলেজে/স্কুলে চান্স পেয়েছি আমি। কিন্তু যেইনা ক্লাস করা শুরু করলাম, অমনি ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, আমি আসলে কিছুই অত ভাল করে পারি না। আমি আসলে এই জায়গায় আসার যোগ্য নয়। এটা বেশ মেধাবীদের জায়গা। তাও দিনশেষে কেমনে কেমনে জানি এখানে পড়াশোনা করে ভাল একটা রেসাল্ট করে ফেললাম।

এবং আত্মবিশ্বাসী হয়ে আর আমার স্বপ্ন পূরণের উদ্দেশ্যে কোন এক কোচিং সেন্টারে (ইঞ্জিনিয়ারিং/ মেডিকেল/ ইউনিভার্সিটি) ভর্তি হলাম। সেই কোচিং এ ক্লাস শুরু করতে না করতেই আবার প্রেশার টের পেতে লাগলাম। আল্লাহর ত্রিরিশটা দিন এক্সাম, এক্সাম আর এক্সাম। এবং অবাক হয়ে দেখতে পেলাম এরই মধ্যে প্রচুর মেধাবী জ্ঞানী গুণী রীতিমত ধাক্কাধাক্কি করছে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্যে। যেখানে আমি এক্সাম দিলে পাই ১০০ তে ১৯, আর এসব মেধাবীরা ৭৩ পেয়ে মাথা পিটায়। নাহ, কিচ্ছু হবে না আমাকে দিয়ে।  খুব হতাশ হয়ে দিন কাটতে লাগল। তাও হাল ছাড়ি নাই। এবং এ যাত্রাতেও কোনমতে পার পেয়ে গেলাম। কেমনে কেমনে জানি আমার মত গাধা বেশ ভাল একটা ইউনিভার্সিটির (ইঞ্জিনিয়ারিং/ মেডিকেল/ জেনারেল) ভাল একটা সাবজেক্ট পেয়ে বসল।

যাই হোক, আত্মবিশ্বাস আরও তুঙ্গে এবার। এবার আমাকে আর ঠেকায় কে? ভার্সিটিতে উঠে পাঙ্খা গজাল। সেই পাঙ্খায় ভর করে উড়তে লাগলাম। যেইনা প্রথম সেমিস্টারের রেসাল্ট দিল অমনি পাঙ্খা রইল আকাশেই, আর আমি মুখ থুবড়ে পড়লাম মাটিতে। কেমনে হইল এইটা?

এবং এর পর থেকেই ধীরে ধীরে বুঝতে পারি, আমি আসলে ভুল জায়গায় চলে আসছি। এইটা আমার জায়গা না। এই যে আমার চারপাশের মানুষজন, এরা অসম্ভব মেধাবী। এরা রাত জেগে পড়াশোনা করে, খুব চটপটে এরা। ক্লাসে স্যারের কথার সাথে সাথে এরা মাথা ঢুলায়, আর সব আমার মাথার উপর দিয়ে যায়। নাহ, আমি আসলে এই জায়গার যোগ্য না। তাও কেমনে কেমনে জানি ৪-৫ বছর পার করলাম। এবং কেমনে কেমনে জানিই একটা ভালো কোম্পানীতে জয়েন করলাম।

এখানে এসে লাইফ স্যাটেল, এরকম একটা ভাব নিয়ে কাজ শুরু করলাম। এবং এখানেও, এখানে এসেও আবার আমার মধ্যে আগের হতাশা ঘিরে ধরল। আমার খালি মনে হতে লাগল, আমি আসলে ধোঁকাবাজ। কিছুই পারি না আমি, ধোঁকা দিয়ে দিয়ে এই পর্যন্ত আসছি। প্রেসেন্টেশনে দাঁড়ালে হাত-পা কাঁপতে শুরু করে, মনে হয়, আজকেই কি শেষ দিন? সব গুমর ফাঁস হয়ে যাবে আজকে? আমি আসলে কিছুতেই যোগ্য না এই জায়গার, কিছুতেই না।

.

.

জীবনে এরকম হাজারো ক্ষেত্রে, আমরা এই হীনমন্বতায় ভুগি, মনে হয় আমি এই কাজের যোগ্য না। আমি যেখানে আছি, সেখানে থাকার যোগ্য না আমি। চারপাশের এত অসাধারণ মানুষদের কাতারে আমি বড় বেমানান। অথচ আমার অর্জন কিন্তু দুর্দান্ত, আমার সাফল্য কিন্তু ঈর্ষণীয়। তাও নিজেকে অনেক ছোট মনে হয়। এই সমস্যাটার একটা গাল ভারি নাম আছে – ইম্পোস্টার সিনড্রোম।

ইম্পোস্টার সিনড্রোম আর হীনমন্বতা’কে একত্রে গুলিয়ে ফেললে কিন্তু ভুল হবে। ইম্পোস্টার সিনড্রোম বেশী হয় সফল ব্যক্তিদের। জীবনে অনেক কিছু পেয়ে বসা মানুষজন অনেকসময় এত অধিক সাফল্য মেনে নিতে পারে না। অন্যদিকে কিছুই না পাওয়া মানুষজন অধিকাংশ ক্ষেত্রে হীনমন্বতায় ভুগেন।  

 

কী কী লক্ষণ? 

১। আমি নিজের প্রশংসা খুব সহজে নিতে পারি না। মনে হয়, আমি আসলে এই প্রশংসার যোগ্য নই।

২। যেকোন কাজে ব্যর্থ হব – এই ভয়টা পেয়ে বসে আমাকে। কাজটা শুরু করলেই মনে হয়, পারব না আমি ঠিকঠাক করতে।

৩। যেই কাজগুলো এখনও করা হয় নি আমার, সেগুলো নিয়েই বেশী মাথাব্যথা আমার। অথচ অন্যান্য সব কাজ কিন্তু বেশ সুন্দর করেই করে ফেলেছি আমি।

৪। যেকোন কাজের সামনে পড়লেই মনে হয়, আমি এই কাজের জন্য যথেষ্ট নই।

৫। ছোটখাটো ভুল নিয়ে আমি প্রচুর সময় পড়ে থাকি, ভুলটা শোধরানো পর্যন্ত আমার ভাল লাগে না। অথচ এদিকে অন্য কাজের বারোটা বেজে যায়। পুরো কাজটা খুব খুব খুব নিখুঁতভাবে করার চেষ্টায় পাগলপ্রায় হয়ে যাই।  

৬। আরে অমুক তো এই কাজে ওস্তাদ, আমিই পারি না শুধু।

৭। বলার সময়ে আমার দুর্বলতাগুলো আগে বলি, স্কিল নিয়ে পরে বলি।

৮। সামনে ভালো চাকরী/প্রমোশন এর সুযোগ, রিস্ক নিব? না থাক, হবে না।

৯। যেকোন কাজ নিয়ে টেনশনে ভুগি, আর প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশী সময় পরিশ্রম দিয়ে ফেলি কাজটার পিছনে।

১০। আমি মানুষকে ধোঁকা দিয়ে এই পর্যন্ত আসছি, সবাই যদি আমার আসল চেহারা দেখত… 

 

কেন ইম্পোস্টার সিনড্রোম?

আমাদের পরিবারের আপনজনেরা বেশীর ভাগ সময়েই আমাদের প্রশংসা করে, আমাদের অল্প সাফল্যেই খুশী হয়ে যায়। অথচ আমরা এত অল্প করে এত প্রশংসা পাওয়াটা ডিজার্ভ করি না। আবার একই সাথে, অনেকক্ষেত্রে, আমাদের কিছু একটা সাফল্য আপনজনের উপর অতটা প্রভাব ফেলতে পারে না। তাদের বিশ্বাস-আবেগের সাথে কনফ্লিক্ট করে বলে হয়ত। এই যে ছোটবেলা থেকে পরিবারের কাছ থেকে কখনও ওভার-রেটেড কখনও আন্ডার-রেটেড ফিডব্যাক, এই থেকেই হয়ত ইম্পোস্টের সিনড্রোমের উৎপত্তি। [এটা একটা ধারণা মাত্র]

সোশ্যাল মিডিয়াও অনেকটা দায়ী এই ইম্পোস্টার সিনড্রোমের জন্য। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই খালি চোখে পড়ে আমাদের পরিচিত মানুষগুলোর সাফল্য আর সাফল্য। দিনভর তাদের ক্রেজি লাইফ দেখে অভ্যস্ত আমরা। এসব দেখতে দেখতে নিজের সাধারণ লাইফ টাকে অর্থহীন মনে হয়। এখান থেকেই মনে দানা বাঁধে, আমি বোধহয় অযোগ্য, কিছু হবে না আমারে দিয়ে। অথচ আর দশটা মানুষের লাইফও যে আমার মতই সাধারণ, তারা যে অনেক আবেগ মিশিয়ে সেই সাধারণ লাইফটাকে অসাধারণ করে আমাদের সামনে উপস্থাপন করছে, সেটা খেয়াল থাকে না আমাদের।    

এছাড়া আমরা প্রায়ই আমাদের ভিতরটার সাথে অন্যান্য মানুষের বাহিরকে মেলাতে চেষ্টা করি, তুলনা করার চেষ্টা করি অবচেতনমনে। আর তাতেই ঝামেলা বাধে। নিজেকে ছোট মনে হয়। এটাও ইম্পোস্টার সিনড্রোম এর একটা বড় কারণ।

সামাজিক দায়বদ্ধতা, চাপ ইত্যাদিও ইম্পোস্টার সিনড্রোম এর জন্যে দায়ী।

 

কীভাবে দূর করব?

১। অন্যে আমাকে নিয়ে কী ভাবতেছে? ভাবুক গে, আমার কি তাতে? আমি আমার কাজ ঠিকঠাক করে যাচ্ছি এবং যাবও।

২। অন্যের সাথে নিজের তুলনা কেন করতে যাব? সবাই যার যার জায়গায় সেরা। আমি কী কী পারি না, আমি কী কী জানি না; তার চেয়ে বেশী গুরুত্বপুর্ণ আমি কী কী পারি, আমি কী কী জানি?  

৩। ভালো একটা প্রমোশন/চাকরী/সুযোগ আমার সামনে, রিস্ক নিব? হ্যা অবশ্যই নিব, হলে হবে, নাহলে নাই। আমি যোগ্য বলেই সুযোগটা আমার দরজায় এসেছে, কয়জনার এমন সুযোগ আসে?

৪। আমার সম্পর্কে আমার বন্ধুরা, আমার কাছের মানুষরা কি ধারণা পোষণ করে? তা নিয়ে খোঁজ খবর নিয়েই দেখি না। এবং দেখতে পেলাম পেলাম, নাহ, সবই আমার মনের সমস্যা। আমি আসলেই জোস!

৫। নিজের চিন্তা ভাবনা আচার আচরণ ডায়েরী তে লিখে ফেলি আমি। এতে করে যখনই পড়তে যাই নিজের চিন্তা ভাবনা গুলো, তখনই খেয়াল হয়, “আচ্ছা, এই কাহিনী! আমি তাহলে ইম্পোস্টার সিনড্রোমে ভুগতেছি? আচ্ছা, কাল থেকে দেখে নিব।”

৬। কাজটা যখন শুরু করেছি, শেষও করতে পারব। ছোটখাটো কিছু ভুল হয়ত থাকবে। একেবারে নিখুঁত হতে হবে এমন কোন কথা নেই।

শতকরা ৭০ ভাগ ব্যক্তিই ইম্পোস্টার সিনড্রোমে ভুগেন জীবনের কোন না কোন সময়ে। এবং সফল ব্যক্তিদেরই ইম্পোস্টার সিনড্রোম বেশী হয়। তাই আপনিও যদি ভুগে থাকেন ইম্পোস্টার সিনড্রোমে, চিন্তার কোন কারণ নেই, চিল…

 

আর ইম্পোস্টার সিনড্রোম যেন আপনার ক্যারিয়ার, লাইফ দখল করে নিতে না পারে সেই ব্যাপারে শুধু একটু সাবধান থাকবেন। আপনি অনেক কিছু অর্জন করেছেন বলেই, আপনি ইম্পোস্টার সিনড্রোমে ভুগছেন, মাথায় রাখবেন এটা। হতাশ হওয়ার কিছু নেই।

 

%d bloggers like this: