Reading Time: 1 minute

শূন্যতম পর্ব

ক্যানো বিতর্ক করবোঃ প্রথম পর্ব

বিতর্কের অ আ ক খ সিরিজের দ্বিতীয় পর্বে(আসলে তৃতীয় পর্ব!) তোমাদের স্বাগতম। গত পর্বে আমরা বিতর্ক করার কারণ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছি। কাজেই ধরে নিতে পারি, তোমরা মোটামুটি Convinced যে বিতর্ক করলে মন্দ হয় না! :p

যখন ঠিক করেই ফেলেছি যে বিতর্ক করবো, তাহলে চলো জেনে নিই ঠিক কি কি বিতর্ক রয়েছে আমাদের করার মতো। 😀
সত্যি কথা বলতে, আমি নিজেও শুরুর দিকে বিতর্কের Format নিয়ে অনেক দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম। কারণ স্কুলের একটা প্রোগ্রামে দেখেছি একরকম বিতর্ক আবার বিটিভিতে দেখি আরেকরকম আবার এক বেসরকারী চ্যানেলে দেখি বিতর্ক অন্য রকম! 😛 তাহলে আসলে জিনিসটা কি রকম!

সত্যি সত্যি ব্যাপার হলো, বিতর্ক অনেক রকমেরই হতে পারে। নামগুলো তোমাদের বলে নিই। বিটিভিতে তোমরা যে বিতর্কটি দেখে এসেছো বা যে Format টির সাথে পরিচিত হয়ে এসেছো তা হলো “সনাতনী বিতর্ক”। স্কুলের প্রোগ্রামে বিচারককে “মাননীয় স্পীকার” বলে সম্বোধন করা বিতর্কটি হলো “সংসদীয় বিতর্ক”। এ দুইটির উপরই আমাদের বেশিরভাগ বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। আর এ সিরিজেও আমরা এ দুটির উপরই সবচেয়ে বেশি জোর দিবো; বিশেষ করে সংসদীয় বিতর্কের উপর। ক্যানো জোর দিবো বা কি সমাচার সেসব নিয়ে পরে আলোচনা করা যাবে। আজকে আমরা কথা বলবো বিতর্কের রকমফের নিয়ে।

সনাতনী আর সংসদীয় বিতর্কের কথা তো তোমাদের বলেই ফেললাম। তাহলে আর কি কি বিতর্কের ধরণ বা Format আছে! যেমন ধরো, বারোয়ারী বিতর্ক, জাতিসংঘ বিতর্ক, ছাত্র-শিক্ষক বিতর্ক, প্ল্যানচেট বিতর্ক, স্রষ্টা-সৃষ্টি বিতর্ক, জুটি-বিতর্ক, বেলুন বিতর্ক, নবীন-প্রবীণ বিতর্ক- এরকম নানা কিছু। তবে এই ফাঁকে তোমাদের জানিয়ে রাখি উপরে যেসব বিতর্কের নাম করলাম বারোয়ারি বিতর্ক ছাড়া বাকিদের সচরাচর খুব একটা দেখা যায় না। যখন কোনো বিতর্ক সংগঠন/ক্লাব/ডিবেটিং সোসাইটি কোন “বিতর্ক উৎসব”(বিতর্ক প্রতিযোগিতা নয় কিন্তু)এর আয়োজন করে তখন এই ধাঁচের বিতর্কদের দেখা মেলে। মূলত এসব Format নিয়ে কোনো প্রতিযোগিতা হয় না; প্রদর্শনীর জন্য এইধরণের বিতর্কের আয়োজন করা হয়। এছাড়াও আরো বেশ কিছু বিতর্কের টাইপ আছে সেসব নিয়ে কথা আর না-ই বা বললাম।

এতোক্ষণ ধরে আমরা খালি বিতর্কের নামই শুনলাম। তাদের ব্যাপারে কিন্তু কিছু জানা হলো না। এবারে আমরা তাদের ব্যাপারে অল্পসল্প জানার চেষ্টা করবো। তবে আগেই বলেছি সনাতনী আর সংসদীয় বিতর্ক নিয়েই সিরিজ চলবে, তাই এদুটোতে আমরা এখন খুব একটা বেশি সময় দিবো না!

বারোয়ারি বিতর্কঃ শিল্পের খুব কাছাকাছি
তোমরা সাধারণত বিতার্কিকদের খুব দ্রুত কথা বলতে শুনে অভ্যস্ত। মনে হয় যেন, কথা বলা শেষ করেই তাদের স্টেশনের শেষ ট্রেন ধরতে যেতে হবে! তাছাড়া অন্যান্য বিতর্কগুলোতে দেখা যায়, কেউ কোনো একটা একটা বিষয়ের পক্ষে বা বিপক্ষে কথা বলে; এর বাইরে কথা বলার সুযোগ নেই।

কিন্তু বারোয়ারি বিতর্ক এখানেই অনন্য। এখানে যে কেউ যেকোনো পক্ষই নিতে পারে! এ কথা শুনে হয়তো অনেকে অবাক হচ্ছো? ভড়কে
যেও না; ব্যাখ্যা করছি। ধরো বিতর্কের বিষয়, স্বাধীনতা তুমি…(হ্যাঁ, বারোয়ারি বিতর্কের বিষয়গুলো একটু কাব্যিক হয়)। আগেই বলে রাখি, এটি দলগত বিতর্ক নয়। কাজেই একজন একজন করে এখানে বক্তব্য দেয়া হয় এবং যে যার মতো করে বিষয়টি উপস্থাপন করে।
এখন আসো কেউ বিতর্ক করলো এভাবে যে, স্বাধীনতা মানে “একটি মানচিত্র”। তারপর সে আবেগ দিয়ে, একটু কাব্যিকভাবে বলবে ক্যানো স্বাধীনতা মানে একটি মানচিত্র। আবার কেউ বলতে পারে স্বাধীনতা মানে “আহত কিছু দলিলপত্রের আহাজারি”। এরপর সে দুঃখ করে বলবে ক্যানো তার কাছে স্বাধীনতা আহত দলিলপত্রের আহাজারি। কারণ হিসেবে সে বলতে পারে, এখন আমাদের স্বাধীনতার চেতনা ভূলুণ্ঠিত, এখন আর মুক্তিযোদ্ধাদের মতো দেশপ্রেম দেখা যায় না- ইত্যাদি। আবার কেউ আরেকটু ভিন্নভাবে বলতে পারে, স্বাধীনতা মানে “আমার বন্ধু রাশেদ”। সে বলতে পারে যে, সে এতো কিছু বুঝে না; মানচিত্র, দলিলপত্র কিচ্ছু না। তার কাছে স্বাধীনতা মানে তার বন্ধু রাশেদের চলে যাওয়া; সে স্বাধীনতার যন্ত্রণা অনুভব করতে পারে তার প্রাণের বন্ধুর মৃত্যুতে, সে দেশকে উপলব্ধি করতে চায় নিজের যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে।

কাজেই দেখতে পাচ্ছো, বিতর্ক কতো বহুমাত্রিক রূপ পাচ্ছে। বারোয়ারি বিতর্কের সৌন্দর্য এখানেই। তাছাড়া শিল্পিত উপস্থাপনার একটা বিরাট জায়গা রয়েছে এ বিতর্কে।

প্ল্যানচেট বিতর্কঃ ভূতসমাজের বিতর্ক

যারা “প্ল্যানচেট” শব্দের মানে জানো না তাদের বলছি, মূলত এটা মৃত আত্মা ডেকে আনার একটা তথাকথিত পদ্ধতি। যারা এ বিষয়ে আরেকটু জানতে চাও তাদের জাফর ইকবাল স্যারের অটোবায়োগ্রাফি “রঙ্গিন চশমা” পড়ে দেখার অনুরোধ থাকলো(তবে ভুলেও এসবে জড়াতে যেও না যেনো!)

তো যাই হোক, এখানে মূলত বিভিন্ন মৃত ব্যক্তির আত্মাদের ডেকে নিয়ে আসা হয়। একজন ওঝা এই ডেকে আনার কাজটি করেন(ভদ্রসমাজে যাকে আমরা সভাপতি বলি আর কি!)তারপর একে একে প্রত্যেক বিতার্কিক একেক আত্মার ভূমিকায় কথা বলেন। বিতর্কের বিষয়গুলো হয় অনেকটা এরকম, “আমার গুণে ধরণী তুমি তিলোত্তমা”। তারপর প্রত্যেক ব্যক্তি এসে এভাবে বলতে শুরু করেন, “হে, মানবজাতি, আজ তোমাদের আহবানে আমি স্বর্গলোক ছেড়ে এসে হাজির হয়েছি তোমাদের ডাকে। আজ তোমরা আমাকে ডেকেছো এটি প্রমাণ করতে ক্যানো আমার গুণে ধরণী আজ তিলোত্তমা!’…এভাবেই তারা কথা বলেন! মজার না জিনিসটা?

প্ল্যানচেট বিতর্কে যাদের ডেকে আনা হয় তারা বেশ ইন্টারেস্টিং। যেমন হিটলার, ওসামা বিন লাদেন, মাস্টার দা সূর্যসেন-এরকম। এখন তোমাদের মনে হতে পারে ওসামা বিন লাদেন বা হিটলার এরা কিভাবে নিজের গুণগান গাইবেন। আসলে এখানেই একজন বিতার্কিকের কৃতিত্ব-তিনি এসব নেগেটিভ ক্যারেক্টারকেও অসাধারণভাবে তুলে আনতে পারেন! যেমন একবার একজন বিতার্কিক ওসামা বিন লাদেন হিসেবে বলেছিলেন, “আমার গুণে ধরণী তিলোত্তমা কারণ আমি মানুষের রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছি। ফলে মানুষ রাতে ঘুমাতে পারতো না। তাই তারা দিনেও জেগে থাকতো, রাতেও জেগে থাকতো। এভাবে আমি মানুষের কর্মঘণ্টা বাড়িয়ে দিয়েছি”! 😛

স্রষ্টা -সৃষ্টি বিতর্কঃ

বিতর্কের এই ধারাটিও বেশ সৃজনশীল। এখানে মূলত কোনো বিখ্যাত শিল্পীর সাথে তার সৃষ্ট শিল্পকর্মের বিতর্ক হয়! কিরকম সেটা?
যেমন ধরো নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ এর সৃষ্ট চরিত্রগুলো কে কে! তোমরা সবাই জানো- হিমু, মিসির আলী, শুভ্র, রূপা। তারপর ধরো শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীকান্ত, দেবদাস। আবার রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতার অমিত কিংবা লাবণ্য।
তোমাদের সুবিধার জন্য Youtube অনেক ঘেঁটে আমার খুব প্রিয় একটি বিতর্ক সংগঠন “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেট অর্গানাইজেশন” এর আয়োজনে হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে অনুষ্ঠিত স্রষ্টা-সৃষ্টি বিতর্কের একটি লিংক দিয়ে দিচ্ছি।

দেখে আসতে চাইলে এখানে ক্লিক করো

জাতিসংঘ বিতর্কঃ

আগেভাগেই তোমাদের জানিয়ে রাখি, ইদানীং MUN(Model United Nations) বলে যে জিনিসটা চালু হয়েছে জাতিসংঘ বিতর্ক মোটেও সেরকম নয়। বরং এটা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বা নিরাপত্তা পরিষদের সম্মেলনের আদলে বানানো একধরণের বিতর্ক যেখানে সদস্য রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন রাষ্ট্রের ভূমিকায় থেকে বিতর্ক করেন। কাজেই ভবিষ্যতে MUN আর জাতিসংঘ বিতর্ককে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলবে না।
যেমন ধরো, বিতর্কের বিষয় হতে পারে, “বিশ্বশান্তি রক্ষায় আমার দেশ অগ্রগণ্য”। এরপর চীনের প্রতিনিধিরা আসেন- তারা প্রমাণ করেন তাদের দেশ বিগত ৫০ বছর কোনোরূপ সহিংসতায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করে নি। তাই তার দেশ সবচেয়ে ভালো। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি বলবে, পুরো বিশ্বের নেতৃত্বে সে আছে দেখেই বিশ্ব এতো ভালো আছে, অন্য কেউ হলে আরো গোলমাল বেঁধে যেতো, সে বলবে তার এককেন্দ্রিক বিশ্ব অনেক স্থিতিশীল।

তবে এখানে খেয়াল রাখার কথা হলো, বিতর্ক করার সময় বিতার্কিককে মনে করতে হবে তিনি ওই দেশের নাগরিক।; নয়তো কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি হন, তবে তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে অন্যায় কাজ করে যাচ্ছে সেসবকে কথার মারপ্যাঁচে ঘুরিয়ে দিয়ে প্রমাণ করতে হবে তার দেশ বেশি শান্তিবাদী! :3

বলে রাখা ভালো, এখানে যিনি বিতর্ক পরিচালনা করেন তাকে “মহাসচিব’ বলে সম্বোধন করা হয়!

জুটি বিতর্কঃ সখী ভালোবাসা কারে কয়!

বিতর্কের এই ধাঁচটি বেশ রোমান্টিক! এখানে বিতার্কিকেরা জোড়া বেঁধে বিতর্ক করেন। আর বিতর্কের চরিত্ররা হন খুব ইন্টারেস্টিং। যেমন লাইলি-মজনু, রোমিও জুলিয়েট, হুমায়ূন আহমেদ-শাওন কিংবা হাল আমলের অনন্ত-বর্ষা! বিষয়গুলো হয় অনেকটা এরকম “প্রেমের পৃথিবীতে আমরাই শ্রেষ্ঠ”!

এরপর বিতার্কিক যারা যে জুটি হয়েছেন তাদের হয়ে কথা বলতে থাকেন এবং প্রমাণ করেন ক্যানো প্রেমের পৃথিবীতে তারাই শ্রেষ্ঠ।
আশা করি, এরই মধ্যে তোমরা বুঝে গেছো বাকি বিতর্কগুলো যেমন- ছাত্র-শিক্ষক বিতর্ক, নবীন-প্রবীণ বিতর্ক-এসব ক্যামন হয়!
আজকের জন্য অনেক হয়ে গেলো; আগামী পর্বে দেখা হচ্ছে নতুন কোনো বিষয় নিয়ে। সে পর্যন্ত ভালো থাকবে!

Happy Debating!

পুনশ্চঃ অনেকের হয়তো মনে হতে পারে যে, এসব বিতর্ক একটু অপ্রচলিত ধাঁচের তাই হয়তো এ ধরণের বিতর্ক করতে গেলে খুব একটা পরিশ্রমের দরকার পড়ে না কিন্তু সত্যিটা হলো, এই ধরণের বিতর্কেই কিন্তু সবচেয়ে বেশি কারিশমা দেখাতে হয় একজন বিতার্কিককে। খুব অভিজ্ঞ কিংবা অসাধারণ বিতার্কিক না হলে কোনোভাবেই এ ধরণের বিতর্কে আসর জমানো যায় না। অতএব, সাধু সাবধান! 😛