Reading Time: 1 minute

বর্তমান বিশ্বের আলোড়ন জাগানো বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রোবটিক্স এন্ড মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং এটি বিশ্বের অন্যতম আধুনিক আনন্দ নিয়ে পড়ার মত একটি বিষয় সাবজেক্ট হিসেবে আমাদের দেশে এর প্রচলন প্রায় নেই বললেই চলে ইতোপূর্বে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ খোলা হয়েছে তবে রোবটিক্স এন্ড মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়টি বাংলাদেশে প্রথমবারের মত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েইউনিটের অধীনে খোলা হয়েছে

এই সাবজেক্ট নিয়ে মানুষের মাঝে কিছু সাধারণ প্রশ্ন দেখা যায় ।

এই সাবজেক্টে কি পড়ানো হয়? এই সাবজেক্টের এপ্লিকেশন কোথায় ? এটি পড়ে আমরা কি ধরনের যোগ্যতা অর্জন করতে পারব? আমাদের চাকুরি ক্ষেত্রটা কি রকম হবে? নতুন সাবজেক্টে ঠিকমত সুযোগসুবিধা পাওয়া যাবে তো? এই সাবজেক্ট পড়তে হলে আমাদের কোন কোন বিষয়ে ভালো ধারণা থাকতে হবে?“

উপরোক্ত প্রশ্নগুলার উত্তর জানার আগে আমাদের জানতে হবে এই সাবজেক্টের তাৎপর্য কি?

রোবটিক্স” এবং “মেকাট্রনিক্স” –এই দুটি বৃহৎ পরিসরের ক্ষেত্রের শাখাপ্রশাখাই এই বিষয়ের মূল প্রতিপাদ্য। প্রথমেই আসি রোবটিক্স কি ? সহজ ভাষায় বলা যায় রোবট হচ্ছে এমন এক প্রকার যন্ত্র যেটি মানুষের কোনো প্রকার ফিজিক্যাল কন্টাক্ট ছাড়াই ব্যবহারকারীর প্রয়োজন অনুযায়ী নিজে নিজে কাজ করতে পারে । কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের মতে, “Robotics is a system that contains sensors, control systems, manipulators, power supplies and software all working together to perform a task.” অনেকেই ধারনা করেন যে, রোবট মানেই হাতপা ওয়ালা মানুষের মত দেখতে একটা যন্ত্র । এই ধারনাটি মোটেও ঠিক নয় । বরং অটোমেটেড যেকোনো যন্ত্র যা চারপাশ থেকে উদ্দীপনা গ্রহন করে প্রয়োজন অনুযায়ী সাড়া প্রদানে সক্ষম, সেটাই রোবট । আর রোবট নিয়ে বিজ্ঞানের যে শাখা আলোচনা করে, সেটা হচ্ছে রোবটিক্স । এবার আসি মেকাট্রনিক্সের ব্যাপারে । মেকানিক্যালের ‘মেকা’ আর ইলেকট্রনিক্সের ‘ট্রনিক্স’ – এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে মেকাট্রনিক্স শব্দটি তৈরি । মেকানিক্যাল,ইলেক্ট্রিক্যাল কম্পিউটার সায়েন্স এই তিনটা সাবজেক্টের সমন্বয়ে মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়টি গঠিত। মূলত যেকোনো মেকানিক্যাল ডিভাইসকে ইলেকট্রনিক্সের মাধ্যমে কন্ট্রোল করার বিভিন্ন পদ্ধতি আর প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনাই এ বিষয়ের মূল সারবস্তু । আর এই মেকানিক্যাল ডিভাইস আর ইলেকট্রনিক্স কন্ট্রোলের মধ্যে সংযোগ সাধনের কাজটি করে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং । কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ছাড়া একে স্বয়ংক্রিয় ভাবে কার্যক্ষম করে তোলা সম্ভব নয়। অনেক বিজ্ঞানীর মতে , “Mechatronics is where science fiction meets reality” আধুনিক সব ফ্যাক্টরি , কারখানা , পাওয়ার প্ল্যান্ট এগুলো চলার ভিত্তি হচ্ছে মেকাট্রনিক্স । কোনো একটা সিস্টেমকে স্মার্ট বানাতে মেকাট্রনিক্সের বিকল্প নেই । অনেকের মধ্যে হয়তো এক ধরনের কনফিউশন কাজ করে যে , রোবোটিক্সও তো মেকাট্রনিক্সের অন্তর্ভুক্ত , তাহলে এটিকে আলাদা করে অধ্যয়নের কি হল ? এই ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অনেকটা ইলেকট্রনিক্স আর কম্পিউটারের মত । কম্পিউটার, ইলেকট্রনিক্সের অনেক বড় একটা অংশ বিধায় এটিকে আলাদা করে অধ্যয়ন করা হয়, ঠিক তেমনি রোবটিক্স , মেকাট্রনিক্সের অনেক বড় ও গুরুত্বপূর্ন অংশ বলে এর কোর্সগুলোর উপর অধিক গুরুত্বারোপ করতে এটিকে আলাদা করে অধ্যয়ন করা হয় । উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ঠিক এই কাজই করা হয় ।

এই সাবজেক্টে কি পড়ানো হয়?

১ । ইলেকট্রনিক্সঃ কোনো ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসকে এনালাইসিস করা, নিজের মত করে সার্কিট ডিজাইন করে ডিভাইস তৈরি, মেকানিক্যাল ডিভাইসকে দক্ষভাবে কন্ট্রোল করার জন্য যতটুকু ইলেকট্রনিক্সের জ্ঞানের প্রয়োজন তা সবই এই কোর্সের অন্তর্ভুক্ত ।

২ । কম্পিউটার প্রোগ্রামিংঃ ইলেকট্রনিক্স ও মেকানিক্যাল সিস্টেমের মধ্যে সমন্বয় সাধনের কাজটি করে এই কম্পিউটার প্রোগ্রামিং । এক্ষেত্রে বেসিক প্রোগ্রামিং থেকে শুরু করে অবজেক্ট ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রামিং সম্পর্কে মোটামুটি ধারনা দেওয়া হয় ।

৩ । কন্ট্রোল সিস্টেমঃ বিভিন্ন প্রকার কন্ট্রোল সিস্টেম, যেমন মাইক্রোকন্ট্রোলার,মাইক্রোপ্রসেসর, পি.এল.সি, আর.এল.সি নিয়ে বিভিন্ন কোর্সে অনেক বিস্তরভাবে আলোচনা হয় ।

৪ । কন্ট্রোল এলগরিদমঃ কন্ট্রোল সিস্টেমকে দক্ষ বানাতে বিভিন্ন প্রকার এলগরিদম,যেমন পি.আই.ডি এলগরিদম, ডেরিভেটিভ এলগরিদম, ইন্টিগ্রাল এলগরিদম প্রভৃতি এই কোর্সের অন্তর্ভুক্ত ।

৫ । ওয়্যারলেস কমিউনিকেশন সিস্টেমঃ ওয়্যারলেস ডিভাইস দিয়ে কোনো কিছুকে কন্ট্রোল করার জন্য ব্লটুথ,ওয়াইফাই,জিএসএম প্রভৃতি মডিউল ও বিভিন্ন প্রকারের ওয়্যারলেস সিস্টেমের প্রোটোকল নিয়ে বিভিন্ন কোর্সে পড়ানো হয় ।

৬ । কম্পিউটার ভিশন এন্ড ইমেজ প্রসেসিংঃ রোবটের দর্শন ক্ষমতা তৈরিতে এই কোর্সটি অনেক গুরুত্বপূর্ন । এই কোর্সে কিভাবে একটি রোবট ইমেজিং সেন্সর থেকে সিগন্যাল গ্রহন,সরবরাহ,কন্ডিশনিং,রূপান্তর,সংরক্ষন ও প্রক্রিয়াকরন করে, তা নিয়ে বিস্তরভাবে পড়ানো হয় ।

৭ । সিমুলেশন প্রোগ্রামঃ বিভিন্ন প্রকারের সিমুলেশন প্রগ্রাম,যেমন ম্যাটল্যাব, ল্যাবভিউ, ফ্লোকোড, ভিজ্যুয়াল স্টুডিও প্রভৃতি প্রোগ্রাম নিয়ে বিভিন্ন কোর্সে পড়ানো হয় ।

৮ । মেকানিক্যাল সিস্টেমঃ ইঞ্জিন,পাম্প,কম্প্রেসর,টারবাইন প্রভৃতি মেকানিক্যাল সিস্টেম নিয়ে বিভিন্ন কোর্সে বিশদভাবে আলোচনা করা হয় । এছাড়াও অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এর উপর বিস্তারিত কোর্স রয়েছে ।

৯ । মেশিন লার্নিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাঃ রোবটকে প্রোগ্রামের বাহিরে নিজে নিজে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহনে সক্ষম বানাতে এই কোর্সটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ।

এই সাবজেক্টের এপ্লিকেশন কোথায় ?

১ । বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র

২ । নিউক্লিয়ার রিএক্টর

৩ । গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী

৪ । বায়োমেডিক্যাল সিস্টেম ডিজাইন

৫ । স্মার্ট ভেহিকেল ডিজাইন

৬ । ন্যানো টেকনোলজি সিস্টেম

৭ । এয়ার ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম

৮ । হিউম্যানয়েড রোবটিক সিস্টেম

এটি পড়ে আমরা কি ধরনের যোগ্যতা অর্জন করতে পারব ?

  • কোনো একটা সিস্টেমকে নিজের মত করে অটোমেটেড করতে পারব ।
  • নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী দরকারী কাজ করতে পারে, এমন রোবট তৈরি করতে পারব ।
  • কোনো একটি অটোমেটেড সিস্টেমকে দক্ষভাবে বিশ্লেষন করতে সক্ষম হবো ।
  • এমবেডেড ইলেকট্রনিক্সকে যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে সক্ষম হবো ।

আমাদের চাকুরি ক্ষেত্রটা কি রকম হবে ?

আমাদের চাকুরি ক্ষেত্রটা হবে অন্য সব বিভাগের থেকে আলাদা । কেননা এই বিভাগ সমগ্র বাংলাদেশের জন্য এই প্রথম । তাই বলে এটা মনে করার কোন কারণ নেই যে এর কোনো ক্ষেত্র এদেশে নেই । বরং, এই সাবজেক্টের ক্ষেত্র সমগ্র বিশ্বে তৈরি হয়েছে বিধায় এই সাবজেক্টটি দেশে খোলা হয়েছে । আর এক্ষেত্রে আশার কথা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকেই এর ক্ষেত্র তৈরিতে অনেক উদ্যেগ নেওয়া হচ্ছে । দেশে অনেক অটোমেটেড ইন্ড্রাস্ট্রি আছে, যেগুলোকে চালানো ও রক্ষনাবেক্ষনের জন্য বিদেশ থেকে এক্সপার্টদের আনতে হয়,যার ফলস্বরূপ প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন ডলার খরচ হয়, এক্ষেত্রে আমাদের দেশের কোনো এক্সপার্ট থাকলে অনেক খরচ কমে যেত এবং দেশের মুদ্রা দেশেই থাকতো । তাই এই সেক্টরটিতে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাবে এই সাবজেক্টে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীরা । বর্তমানে গাজিপুরের কালিয়াকৈরে যে হাইটেক পার্ক গড়ে উঠছে,যেখানে বিশ্বের নামীদামী কোম্পানিগুলো জায়গা করে নিবে, সেখানে চাকরির ক্ষেত্রে অবশ্যই এই ব্যাকগ্রাউন্ডের ছাত্রছাত্রীরা অগ্রাধিকার পাবে । এছাড়াও ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমকে অটোমেটেড করতেও এই বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। মোট কথা, বাংলাদেশ সরকার টেকনোলজিকাল দিকে যে উদ্যোগ নিচ্ছে, তা বাস্তবায়ন করতে এই সাবজেক্টে পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে ।

 

 

নতুন সাবজেক্টে ঠিকমত সুযোগসুবিধা পাওয়া যাবে তো ?

এটা আমরা সবাই জানি যে, নতুন সাবজেক্ট হলে তার কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে; যেমন ল্যাবের সুবিধা, ভালো বই, ভালো একটি গাইডলাইন । কিন্ত এসবের মাঝেও নতুন সাবজেক্টের শিক্ষার্থীরা একটি অনন্য সুবিধা পায়, সেটি হচ্ছে পরবর্তীদের জন্য প্রতিনিধি হওয়া । এক্ষেত্রে নতুন শিক্ষার্থীরা ডিপার্টমেন্টটিকে নিজের মত করে গড়ে তোলার সুযোগ পায় । এছাড়াও বাংলাদেশের বৃহত্তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এখানে আধুনিক প্রযুক্তির সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করা হচ্ছে । ইতোমধ্যেই বিভাগে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ মেকাট্রনিক্স, ইলেক্ট্রনিক্স এবং কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। রোবটিক্স ল্যাব স্থাপনের কাজও শুরু হয়ে গেছে। বিভাগের কোর্সের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিভিন্ন ওয়ার্কশপ ও সেমিনারের আয়োজন করা হচ্ছে। এক কথায় বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রোবটিক্স ও মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং এর সর্বোচ্চ সুবিধা দেওয়ার জন্য কাজ চলছে।

এই সাবজেক্ট পড়তে হলে আমাদের কোন কোন বিষয়ে ভালো ধারনা থাকতে হবে ?

এই সাবজেক্ট পড়ার প্রধান শর্ত হচ্ছে তোমাকে অনেক ধৈর্যশীল হতে হবে আর কোনো কিছু নিয়ে লেগে থাকার প্রবণতা থাকতে হবে । কেননা কোনো একটা সিস্টেম ডিজাইন করা খুব সহজ কথা নয় । বার বার ভাঙ্গাগড়ার খেলা করার মাধ্যমে একটা কিছুকে দাঁড় করানোই এক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ । এছাড়াও গণিতে শক্ত ভিত্তি, পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা, ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের প্রতি আগ্রহ, সব কিছু বুঝে বুঝে পড়ার অভ্যাস – এগুলোও প্রয়োজন । আর সব থেকে বেশি প্রয়োজন থিওরিটিক্যাল জ্ঞানকে প্রাকটিক্যাল লাইফে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা ও তা নিয়ে লেগে থাকা ।

 

সবশেষে বলবো যে, তুমি যদি নব্বইয়ের দশকে ’ রোবোকপ ‘ টিভি সিরিজ দেখে রোবট বানানোর স্বপ্ন দেখে থাকো, ‘ আয়রন ম্যান ‘ সিনেমা দেখে ওইরকম কিছু তৈরি করার স্বপ্ন দেখে থাকো – তাহলে তোমার জন্য অপেক্ষায় আছে শহীদ মিনারের বিপরীত পার্শ্বে অবস্থিত কাজী মোতাহার হোসেন ভবনের ৩য় তলা, যেখানে তোমার এই স্বপ্ন পূরণের কাজগুলো হয় ।

So, the choice is yours.

 

লেখকঃ

ওমরইবনেশহীদ

ডিপার্টমেন্ট অব

রোবটিক্স এন্ড মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং (১ম ব্যাচ),

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

%d bloggers like this: