Reading Time: 1 minute

নাইম, ঢাকায় নটর ডেম কলেজে সায়েন্স গ্রুপ সেভেনে পড়াশোনা করে সে।

শুধু পড়ে বললে ভুল হবে, গ্রুপ সেভেনের ক্যাপ্টেনও বটে। কলেজের বিভিন্ন কাজে তাই তাকে বেশ প্রথমেই এবং অগ্রণী ভূমিকায় দেখা যায়। কিছুদিন পূর্বে কলেজে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়া কর্মসূচী চালু হলে প্রতি সপ্তাহে নাইমকে ক্লাসে ঘোষণা করা লাগত,” তোমরা যারা বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সদস্য আছো…..” এতটুকু বলতেই ক্লাসের বাকিরা হাসিতে লুটিয়ে পড়ত, তার ঘোষণা শেষ হবার আগেই। কারণটা কি কেউ ধরতে পেরেছ? হ্যাঁ, সে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছেলে। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সদস্যকে সে এমনভাবে উচ্চারণ করত যাতে স, শ আর ষ এর আদৌ কোনো উচ্চারণ খুঁজে পাওয়া যায়না। এই বৈশিষ্ট্যটা শুধু নাইমের না, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ও ভৌগোলিকভাবে তার আশেপাশের অঞ্চলের মানুষের বৈশিষ্ট্য।

তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ এর বরেন্দ্র এলাকার মানুষের মাঝে এই উচ্চারণ সমস্যা নেই তবে তাদের কথায় টান অনেক বেশি থাকে।

ভৌগোলিক অবস্থাঃ চাঁপাইনবাবগঞ্জ

ওহ, তোমাদের তো চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভৌগোলিক অবস্থানের কথা বলাই হয়নি। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে পশ্চিমের জেলা। এরপর আরো পশ্চিমে যেতে থাকলে ভারতের মালদহ জেলা এসে পড়ে। এই জেলার বুকের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে মহানন্দা নদী। এই নদীর পশ্চিমাংশ তথা শিবগঞ্জ, ভোলাহাট উপজেলা এবং সদর ও গোমস্তাপুর উপজেলার কিছু অংশকে বলা হয় দিয়াড় অঞ্চল। আর নদীর পূর্বাংশকে তথা নাচোল উপজেলা এবং সদর ও গোমস্তাপুর উপজেলার বাকি অংশকে বলা হয় বরেন্দ্র অঞ্চল যা রাজশাহী পর্যন্ত বিস্তৃত।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ - ২

চাঁপাইনবাবগঞ্জঃ আমের জন্য বিখ্যাত

নদী ও সেতুঃ চাঁপাইনবাবগঞ্জ

নদীর কথা যখন বলা হচ্ছে তখন চাঁপাইনবাবগঞ্জ এর কয়েকটি নদীর নাম জেনে নিই। মহানন্দা নদী ছাড়াও পূর্ণভবা, পাগলা, মরাপাগলা এবং পদ্মা নদীর কিছু অংশবিশেষ রয়েছে। পদ্মানদীর উপর নির্মিত বিখ্যাত পদ্মা বাঁধ জেলার এর কালীনগর এলাকায় অবস্থিত। চাঁপাইনবাবগঞ্জ এ মহানন্দা নদীর উপর ৩ টি সেতু রয়েছে। গোমস্তাপুরে রহনপুর সংযোজক সেতু, নবাবগঞ্জ শহরে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহীউদ্দীন জাহাঙ্গীর সেতু এবং নবনির্মিত সাহেবের ঘাট এলাকার শেখ হাসিনা সেতু।
নদীর কথা বলতে বলতে নাইমের কথা ভুলে গেছি। আসলে ঢাকায় কয়েকমাস থাকতে না থাকতেই নাইমের আঞ্চলিকতা দোষে দুষ্ট হবার সমস্যাটা ভাল হয়ে গিয়েছিল। এখন, নাইমের অনেক বন্ধুও হয়েছে। একদিন নাইমের এক বন্ধু নাইমকে জিজ্ঞেস করল,
– মাম্মা, তোর বাড়ি কোন উপজেলায়?
– শিবগঞ্জ
– ফাজলামো করিস কেন? শিবগঞ্জ তো আমার এলাকা। এটা বগুড়ার উপজেলা।
– আরে নাহ, এটা আমার চাঁপাইনবাবগঞ্জের উপজেলা।
এই নিয়ে তারা ঝগড়া করতে প্রায় শুরু করেছিল। কিন্তু তারা ঝগড়া শুরু করার আগেই আমি তাদেরকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের উপজেলাগুলো সম্পর্কেও বুঝিয়ে দিলাম। ফলে আর তাদের মাঝে ঝগড়া হলনা। তোমরাও বুঝবে? আচ্ছা, চলো দেখি কি বোঝানো যায়।

উপজেলা ও সীমানাঃ চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ -এ মোট ৫ টি উপজেলা রয়েছে যাদের নাম হলঃ

  • ১. চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর (পৌরসভা রয়েছে)
  • ২. শিবগঞ্জ (সীমান্ত এলাকা)
  • ৩. গোমস্তাপুর
  • ৪. নাচোল ও
  • ৫. ভোলাহাট। (সীমান্ত এলাকা)

এই ৫ টি উপজেলার শিবগঞ্জ নামের আরেকটি উপজেলা বগুড়াতেও রয়েছে। পার্থক্য শুধু বগুড়ার শিবগঞ্জ দই এর জন্য বিখ্যাত আর চাঁপাইনবাবগঞ্জ এর শিবগঞ্জ আমবাগানের জন্য বিখ্যাত।
এই ৫ টি উপজেলা মোট ৩ টি সংসদীয় এলাকায় বিভক্ত।

  • জাতীয় সংসদ নির্বাচনী এলাকা ৪৩-চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ)
  • জাতীয় সংসদ নির্বাচনী এলাকা ৪৪-চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ (নাচোল, ভোলাহাট ও গোমস্তাপুর)
  • জাতীয় সংসদ নির্বাচনী এলাকা ৪৫-চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর)

আমরা বাচ্চা-কাচ্চা মানুষ। সংসদীয় ব্যাপার-স্যাপারে না যাই। বরং, বাচ্চা মানুষ ঘুরতে ভালোবাসি। তাই, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এর দর্শনীয় কিছু স্থান সম্পর্কে জেনে নিই।

দর্শনীয় স্থানঃ চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ এ আছে ঐতিহাসিক ছোট সোনামসজিদ।যাকে গৌড়ের ছোট সোনামসজিদ বলা হয়। নবাবগঞ্জ জেলা শহর থেকে ৩৫ কিমি পশ্চিমে এটি অবস্থিত। শিবগঞ্জ উপজেলার অধীনে অবস্থিত এই স্থানটি বাংলাদেশের একটি স্থলবন্দরও বটে। এখানে আছে তহাখানা নামক প্রাচীন দূর্গ, শাহ নেয়ামাতুল্লাহর মাজার, চামচিকা মসজিদ, চল্লিশ দরগা সহ নানা প্রাচীন মুসলিম নিদর্শন।
সোনামসজিদ যাবার পথেই আছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আম বাগান। মাইলের পর মাইল যেদিকে চোখ যায় শুধু আমগাছ। নয়ানভিরাম এই দৃশ্য দেখতে পাওয়া যাবে কানসাট এলাকায়। শিবগঞ্জ উপজেলা প্রায় পুরোটাই আমবাগানে পূর্ণ। জুন থেকে জুলাই মাসে এই এলাকায় আসলে গাছে চড়ে আম খাবার মজা অনুভব করা যাবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ - ১

১। ছোট সোনামসজিদ।
২। মহানন্দা নদী ও বীরশ্রেষ্ঠ মহীউদ্দীন জাহাংগীর সেতু।
৩। ১৯৭১ এর গণকবর।
৪। শেখ হাসিনা সেতু।

ভোলাহাট উপজেলায় রয়েছে অন্যতম বৃহৎ বিল, বিল ভাতিয়া। আছে গোমস্তাপুরের জমিদার বাড়ী, পূর্ণভবা নদীর বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত বিভাজন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে আছে কল্যাণপুর এলাকার হর্টিকালচার, বিশ্বরোড এলাকার আম গবেষণা কেন্দ্র, সাহেবের ঘাট এলাকায় নতুন নান্দনিক শেখ হাসিনা সেতু, পদ্মা বাঁধ ইত্যাদি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ এ তোমার জন্য অপেক্ষা করছে সবুজের বিস্তৃত সমারোহে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি। ঢাকা থেকে নবাবগঞ্জ শহর, শিবগঞ্জ, কানসাট এবং রহনপুর পর্যন্ত সরাসরি বাস যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। বাসে ঢাকা থেকে প্রায় ৬ ঘন্টায় নবাবগঞ্জ শহরে পৌছানো যায়। এছাড়াও রেলপথে আন্তঃনগর সিল্কসিটি, পদ্মা এবং ধুমকেতু এক্সপ্রেস রাজশাহী টু ঢাকা রুটে চলাচল করে। রাজশাহী থেকে কমিউটার ট্রেনের মাধ্যমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌছানো যায়।

লোক-সংস্কৃতিঃ চাঁপাইনবাবগঞ্জ

যে বিশাল বিবরণ দিয়েছি, তাতে অনেকের এই জেলা ভ্রমণের ইচ্ছা দমে গিয়েছে হয়ত। চলো,এই জেলার লোক-সংস্কৃতি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা নেবার চেষ্টা করি। এর মাধ্যমেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ কাহিনীর পরিসমাপ্তি ঘটাবো।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ এর লোক-সংস্কৃতি অন্যতম বিখ্যাত এবং সুপ্রাচীন। নানা-নাতীর গম্ভীরা গান (স্থানীয় ভাষায় নানা-লাতীর গম্ভীরা), আলকাপের গান, বিভিন্ন ধরণের গীত (স্থানীয় ভাষায় গীদ): যেমন, বিয়ের গীত, জন্মদিনের গীত, বৌভাতের গীত, খাৎনার গীত ইত্যাদি। লোকজ সংগীতে রকিবুল ইসলাম ও কুতুবুল আকতার এর নাম বিখ্যাত। বর্তমানে মহানন্দা নদীর তীরবর্তী শিল্পকলা একাডেমী এই লোকজ শিল্পের ধারা ধরে রাখতে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
নাইম চাঁপাইনবাবগঞ্জ এর একজন সন্তান হিসেবে গর্বিত। সে এখনও এই জেলার টানে প্রতি মাসেই কয়েকবার ঢাকা থেকে বাড়ীতে ছুটে যায়। শাহ নেয়ামাতুল্লাহর চারণভূমি, শেরেবাংলার স্মৃতিবিজড়িত আদিনা কলেজ, মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গকারী শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহীউদ্দীন জাহাঙ্গীর এর কবর এবং যুদ্ধক্ষেত্র, কাঁসাশিল্পের ঐতিহ্যবাহী এলাকা, বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান স্থলবন্দরের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ শুধু নাইমকে নয়, সবাইকে হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকে।

আব্দুল মুহাইমিন
সবকিছুই ভালবাসতে ভালোলাগে, তবে আপাতত বিজ্ঞানকেই ভালোবাসি।
আব্দুল মুহাইমিন
আব্দুল মুহাইমিন
আব্দুল মুহাইমিন

Latest posts by আব্দুল মুহাইমিন (see all)