Reading Time: 1 minute

গত পর্বে নাক চোখ বুজে মুখস্ত করার বদলে মনে রাখার জন্যে কার্যকর কিছু পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছিলো, যেগুলোর সবগুলোর পিছনেই রয়েছে বিজ্ঞানসম্মত কার্যকারণ। এ পর্বে আমরা আরো কিছু এরকম বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমাণিত পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চলেছি যেগুলো জানার পরে সবচেয়ে বিরক্তিকর একঘেয়ে তথ্যগুলোও আমাদের কাছে মনে রাখাটা সহজ হয়ে উঠবে।

 

আগের পর্বে আমরা অনেকটা জেনারালাইজড কন্সেপ্ট নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। এবার আমরা ট্রিকি পদ্ধতিগুলো সম্পর্কে জানবো।

 

১। ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্তকরণঃ

thinking-brain

 

আমাদের মস্তিষ্ক একটানা লম্বা কোন তথ্য সহজে প্রসেস করতে পারেনা। অপেক্ষাকৃত লম্বা তথ্যগুলো ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ করা হলে আমাদের পক্ষে মনে রাখা অনেকটা সহজ হয়ে যায়।উদাহরন এর মাধ্যমে ব্যাপারটা স্পষ্ট করতেছি।দেখো তো নিচের সংখ্যা টা মনে রাখতে পারো কিনা।

১২১৯৬৯১৯৭১১৯৫২১৯৪০১২

কি অসম্ভব মনে হচ্ছে তাই তো? তাহলে চলো এবার বিজ্ঞান কে কাজে লাগাই।আগেই বলা হয়েছে ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ করার মাধ্যেমে কোন তথ্য প্রসেস করাটা আমরা আমাদের প্রিয় মস্তিষ্কের জন্যে অনেক সহজ করে তুলতে পারি।তাহলে এক্ষেত্রেও সেরকম কিছু চেস্টা করে দেখা যাক

১২-১৯৬৯-১৯৭১-১৯৫২-১৯৪০-১২

কি এখন পারবে তো মনে রাখতে?গত পর্বে আমরা সম্পর্ক স্থাপন এর গুরত্ব নিয়ে আলোচনা করেছিলাম।এখানেও যদি এরকম একটা সম্পর্ক স্থাপন করা যায় তাহলে পুরোটুকু মনে রাখা একদম ই ছেলেখেলা হয়ে যাবে

১৯৬৯- গণ অভ্যুত্থান

১৯৭১- স্বাধীনতা যুদ্ধ

১৯৫২- ভাষা সংগ্রাম

১৯৪০- লাহোর প্রস্তাব

এবার তাহলে বুঝতে পারতেছো কেন আমরা ফোন নাম্বার এর ক্ষেত্রে ভেঙ্গে ভেঙ্গে বলি কিংবা লিখি? আমরা এখানে আসলে না বুঝেই গ্রুপিং এর সুবিধাটা নিচ্ছি।

 

এরকম আরো একটা উদাহরণ দেখা যাক। মনে করি আমাদের নিচের দেশগুলোর নাম মনে রাখতে হবেঃ

জাপান, চীন, ফ্রান্স, কানাডা, বাংলাদেশ, কানাডা, গ্রীস, মেক্সিকো, ইতালি

সব গুলো দেশের নাম মনে রাখাটা একটু কঠিন হয়ে যাচ্ছে না? আচ্ছা এক্ষেত্রে আমরা কিভাবে গ্রুপে ভাগ করবো? এভাবে চেস্টা করে দেখা যাক

এশিয়া- বাংলাদেশ, জাপান, চীন

ইউরোপ- ফ্রান্স, ইতালি, গ্রীস

আমেরিকা- কানাডা, মেক্সিকো

এবার নিশ্চিতভাবে দেশগুলোর নাম মনে রাখাটা সহজ হবে আমাদের জন্যে।

 

০২। নেমোনিকস(Mnemonics): নেমোনিকস! সেটা আবার কি!নেমোনিকস টার্ম টা শুনতে যতই উদ্ভট হোক না কেন, আমরা সবাই ছোটবেলা থেকে নেমোনিকস ব্যাবহার করে আসছি -নেমোনিকস সম্পর্কে না জেনেই। যেমন সূর্যের সাত রঙ এর কথাই ধরা যাক। সূর্যের সাত রঙ মনে রাখার জন্যে ‘বেনীআসহকলা’ এর কথা আমরা সবাই জানি। এটাই হলো নেমোনিকস।

FINAL_logo1_sm

আরো কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক।

  • DearKing Philip Come Over For Good Soup- Domain, Kingdom, Phylum, Class, Order, Family, Genus, Species ( শ্রেণীবিন্যাস এর ধাপসমূহ)

 

  • ও এস.এস.সি তে পড়ে – Oxygen, Sulfur, Selenium, Tellurium, Polonium (গ্রুপ VI মৌলসমূহ)
  • One Old Olympus Towering Top A Finn And German Viewing Some Hope – অলফ্যাক্টরি, অপটিক, অকুলোমোটর, ট্রকলিয়ার, ট্রাইজেমিনাল, এবডুসেন্স, ফেসিয়াল, অডিটরি, গ্লোসোফ্যারিঞ্জিয়াল, ভেগাস, স্পাইনাল এক্সেসরি, হাইপোগ্লোসাল (১২ জোড়া করোটিক স্নায়ু, ইন্টারমিডিয়েট বায়োলজি এর জন্যে যা সিরিয়াল অনুযায়ী মুখস্ত করতে হয়)

 

এগুলো ছিলো নেমোনিকস এর কিছু প্রচলিত উদাহরণ; তোমাদের যখনই আপাতাদৃষ্টিতে সম্পর্কহীন কোন একটা লিস্ট মনে রাখতে হবে তখনই তোমরা নিজেদের মতো করে নেমোনিকস কে কাজে লাগাতে পারো।

যেমন যদি তোমাকে বাজার থেকে নিচের দ্রব্যগুলো আনতে বলা হয়ঃ

  • চিনি
  • টুথপেস্ট
  • ডাল
  • তেল
  • সাবান
  • লবণ

এতগুলো দ্রব্য তোমার পক্ষে আলাদা আলাদা ভাবে মনে রাখা অসম্ভব ই বলতে হবে। তো চলো আমরা এখানে নেমোনিক্স কে কাজে লাগাই। প্রতিটা আইটেম এর প্রথম অক্ষর নিয়ে একটা শব্দ বানাই- ‘তেটুডাচিসাল’ (ভাষা বাংলা হওয়ার কারণে এমন হাস্যকর এবং অদ্ভুত লাগছে শুনতে, কিন্তু কাজ ঠিক ই করবে)। শুধুমাত্র ‘তেটুডাচিসাল’ শব্দ টা জোড়ে জোড়ে কয়েকবার বললেই মনে গেথে যাবে।পরে বাজারে যাওয়ার পর এই একটা শব্দ দিয়ে ই পুরো লিস্ট টা আবার মনে করা যাবে। যেমনঃ

তে- তেল

টু- টুথপেস্ট

ডা- ডাল

চি- চিনি

সা- সাবান

ল- লবণ

 

০৩।ভার্বাল মেমোরি vs ভিজুয়্যালমেমোরিঃ উপরের যে লিস্টের কথা বললাম তা যদি তোমরা শুধু মাত্র টেক্সট আকারে মনে রাখো তবে তা হবে ভার্বাল মেমোরি। কিন্তু যদি সাবান বলার সাথে সাথে একটা লাইফবয় সাবানের ছবি মনের মধ্যে ভেসে উঠে এবং সেটা মনে রাখো সেটা হবে ভিজুয়্যাল মেমোরি।

screen-shot-2012-01-17-at-2-24-18-pm

ভিজুয়্যাল মেমোরি সবসময় ই ভার্বাল মেমোরি এর থেকে শক্তিশালী।অর্থাৎ কোন কিছু টেক্সট আকারে মনে রাখার চেয়ে ছবি (কিংবা ভিডিও) আকারে মনে রাখা অনেক সহজ। এজন্যেই আমাদের অনেকেরই পরীক্ষার হলে বসে লিখতে গিয়ে বইয়ের লেখা বক্তব্য মনে না পড়লেও বইয়ের পৃষ্ঠা এর ছবি মনে ভেসে উঠে ।উপরের লিস্টের কথা ধরা যাক। তো এই লিস্ট আমরা কিভাবে ভিজুয়্যাল মেমোরি এর মাধ্যমে মনে রাখবো? এভাবে একটা ঘটনার কথা মনে করো, একদিন তুমি ডাল খেয়েছো, ডাল খেয়ে হাতে তেল লাগায় তুমি সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে কোলগেট এক্টিভ সল্ট টুথপেস্ট দিয়ে দাত ব্রাশ করলে এবং তারপর চিনিগুড়া প্রেম নাটক দেখতে শুরু করলে।খুবই হাস্যকর এবং অদ্ভুত কল্পনা।কিন্তু এটা একটা ভিজুয়্যাল মেমোরি এবং যা শুধু একগাদা জিনিস এর লিস্ট মুখস্ত করার থেকে মনে রাখা অনেক সহজ।এখানে আমরা যে ঘটনাটির কথা বললাম সেটাতে আমাদের লিস্টের প্রতিটা আইটেম এর কথা আছে।তাই শুধুমাত্র ঘটনাটি মনে রাখার মাধ্যমেই আমরা পুরো আইটেম এর লিস্ট মনে রাখতে পারবো।

আমরা এতোক্ষণ যেটা শিখলাম তাহলো মানুষের মস্তিষ্ক এবং স্মৃতি এর বৈশিষ্ট্যগুলো মাথায় রেখে কিভাবে মুখস্ত করার ব্যাপারটিকে আরো সহজ করে তোলা যায়।এখানে শুধু কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ এবং কার্যকরী পদ্ধতির কথা বলতে চেস্ট করা হয়েছে। তবে সবার ক্ষেত্রে একই পদ্দতি সমানভাবে কার্যকরী নাও হতে পারে।সেক্ষেত্রে আমাদের উচিৎ নিজেকে আরো বুঝার চেস্টা করা এবং নিজের জন্যে সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি খুজে বের করা।

শেষ করার আগে প্রথম পর্বের এলোমেলো নামগুলোর লিস্ট মনে রাখার একটা সহজ পদ্ধতি বলে দিতে চাই।প্রথম পর্বেই আলোচনা করা হয়েছে এতদিন যেভাবে তোমরা সবাই মুখস্ত করে এসেছো সেভাবে মুখস্ত করার চেস্টা করা হলে ৫-৬ টার বেশি নাম মনে রাখা সম্ভব হবে না।এখানে আমরা ভিজুয়্যাল মেমোরি গঠনের কনসেপ্ট ব্যাবহার করবো।নামগুলো ছিলোঃ

১)মীম

২)তন্বী

৩)নিশাত

৪)শিলা

৫)শুভ্রা

৬)নীলাঞ্জনা

৭)ছালছাবিল

৮)শিশির

৯)মিতু

১০)দোলা

তো এভাবে মনে রাখা যেতে পারে- মীম নামের একটি মেয়ে(তন্বী) নিশি (নিশাত) রাতে সাদা(শুভ্রা) জামা এবং নীল(নীলাঞ্জনা)চুড়ি পড়ে ছলছল(ছালছাবিল) পায়ে পাথর(শিলা) বিছানো শিশির ভেজা এক রাস্তা ধরে তার মিতা(মিতু) দোলা এর বাসায় গেলো।পুরো ঘটনাটা কয়েকবার মনে মনে কল্পনা করলে আশা করা যায় আমরা অনেক লম্বা সময় পরেও সাফল্যের সঙ্গে সবগুলো নাম আবার মনে করতে পারবো।কি মনে থাকবে তো তাহলে মনে রাখার বৈজ্ঞানিক ক্রিয়াকৌশল? 😀